মানবজীবনের উৎকর্ষ সাধন ও সফলতা অর্জনের জন্য ধর্মীয় জ্ঞানকে অপরিহার্য বলে মনে করা হয়। ইসলাম ধর্মে জ্ঞানার্জনকে প্রতিটি মুসলিমের জন্য ফরজ বা আবশ্যিক কর্তব্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে জ্ঞানার্জনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বলা হয়েছে, ‘পড়ো তোমার প্রভুর নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন’ (সুরা আলাক, আয়াত: ১)। অন্যদিকে হাদিসে মহানবী (সা.) স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২২৪)।
ধর্মীয় জ্ঞানের ঘাটতি হলে মানুষ ইমান ও আকিদার ক্ষেত্রে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। সঠিক জ্ঞানের অভাবে অনেকেই আল্লাহর একত্ববাদ সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারে না। ফলে শিরক ও বেদাতের মতো গুরুতর পাপে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ প্রসঙ্গে মহানবী (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘আমাদের এই শরিয়তে সংগত নয়, কেউ এমন কিছুর অনুপ্রবেশ ঘটালে তা প্রত্যাখ্যান করা হবে’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৬৯৭)।
জ্ঞানের আলো না থাকলে মানুষ অন্ধ অনুকরণের শিকার হয়। পূর্বপুরুষ বা সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড সত্য-মিথ্যা যাচাই না করেই গ্রহণ করে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। কোরআনে এই ধরনের আচরণকে চরম ক্ষতিগ্রস্তদের পথ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর যখন তাদের (কাফেরদের) বলা হয়, আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, তোমরা তার অনুসরণ করো, তখন তারা বলে, ‘না, বরং আমরা তো শুধু সে সকল বিষয়েরই অনুসরণ করব, যার ওপর আমরা আমাদের বাপ-দাদাকে পেয়েছি।’ আচ্ছা! যখন তাদের বাপ-দাদা (দ্বীনের) কিছুমাত্র বুঝ-সমঝ রাখত না, আর তারা কোনো (ঐশী) হিদায়াতও লাভ করেনি, তখনো কি (তাদের অনুসরণ করা উচিত)? (সুরা বাকারাহ, আয়াত: ১৭০)
অজ্ঞতা মানুষকে পাপ ও চারিত্রিক স্খলনের দিকে ঠেলে দেয়। আল্লাহর শাস্তি ও পুরস্কার এবং হালাল-হারামের বিধান সম্পর্কে অজ্ঞ থাকলে মানুষ সহজেই প্রবৃত্তির দাসত্ব গ্রহণ করে নেয়। কোরআনে এ ব্যাপারে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘বলে দাও, আমার প্রতিপালক তো হারাম করেছেন অশ্লীল কাজসমূহ—প্রকাশ্য হোক বা গোপন এবং সর্বপ্রকার পাপ, অন্যায়ভাবে (কারও প্রতি) সীমালঙ্ঘন, আল্লাহ যে সম্পর্কে কোনো প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি, এমন জিনিসকে আল্লাহর শরিক সাব্যস্তকরণ এবং আল্লাহ সম্বন্ধে এমন কথা বলাকে, যে সম্পর্কে তোমাদের বিন্দুমাত্র জ্ঞান নেই’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩৩)।
পার্থিব জীবন ও সমাজব্যবস্থায়ও জ্ঞানের অভাব মারাত্মক প্রভাব ফেলে। জ্ঞানহীন সমাজ কখনো উন্নতি করতে পারে না; বরং অন্যায়, জুলুম, অবিচার ও দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। যখন সমাজে যোগ্য ও জ্ঞানী মানুষের অভাব ঘটে, তখন অযোগ্য ও মূর্খ লোকেরা নেতৃত্বের আসনে বসে গোটা জাতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই কেয়ামতের অন্যতম আলামত হচ্ছে জ্ঞান তুলে নেওয়া হবে এবং অজ্ঞতার বিস্তার ঘটবে’ (সহিহ বুখারি: ৫৫৭৭, সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৭১)।
পরকালেও জ্ঞানের অভাবের ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘এবং তারা বলবে, আমরা যদি শুনতাম অথবা বুদ্ধি খাটাতাম, তবে আজ জাহান্নামিদের অন্তর্ভুক্ত হতাম না’ (সুরা মুলক, আয়াত: ১০)। ইসলাম মানুষকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে আলোর পথে আনার জন্য জ্ঞানের মশাল জ্বালিয়েছে। তাই অজ্ঞতার অভিশাপ থেকে মুক্তির জন্য সঠিক ও পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন প্রত্যেক মুসলমানের অপরিহার্য কর্তব্য বলে বিবেচিত। লেখাটি প্রস্তুত করেছেন মাহমুদ হাসান ফাহিম, শিক্ষক, বাইতুল আকরাম মসজিদ ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্স, টঙ্গী এবং হাফসা বিনতে সিরিন।



