দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোর শাখা, উপশাখা ও বুথ স্থাপন, স্থানান্তর এবং ভাড়া গ্রহণে শৃঙ্খলা ফেরাতে একটি সমন্বিত নীতিমালা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ‘ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ’ থেকে ‘ব্যাংক ব্যবসা কেন্দ্র স্থাপন, স্থানান্তর, ভাড়া/ইজারা গ্রহণ ও চুক্তি নবায়ন সংক্রান্ত নীতিমালা’ শীর্ষক এই নির্দেশনা রোববার জারি করা হয়। এর মূল লক্ষ্য ব্যাংকগুলোর পরিচালন ব্যয় হ্রাস করে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং শহর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে সুষম ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করা।
নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, শহর এলাকায় কোনো শাখার আয়তন সর্বোচ্চ ছয় হাজার বর্গফুটের বেশি হতে পারবে না। অন্যদিকে পল্লি এলাকায় এই সীমা তিন হাজার বর্গফুট। উপশাখার জন্য সর্বোচ্চ এক হাজার বর্গফুট, কালেকশন বুথের জন্য ৩৫০ বর্গফুট এবং এটিএম বুথের জন্য ১০০ বর্গফুট জায়গা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ভাড়ার ক্ষেত্রে কঠোর শর্ত আরোপ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকগুলোকে শাখা বা সেবাকেন্দ্রের জন্য ন্যূনতম ছয় বছরের ভাড়া চুক্তি করতে হবে। চুক্তির প্রথম তিন বছরের মধ্যে কোনোভাবেই ভাড়া বাড়ানো যাবে না। তিন বছর পর বাড়ানোর প্রয়োজন হলে তা মূল ভাড়ার ১৫ শতাংশের বেশি হবে না। সার্ভিস চার্জের পরিমাণও মূল ভাড়ার ১০ শতাংশের বেশি নির্ধারণ করা যাবে না।
শাখা স্থাপনের ক্ষেত্রে অনুমোদন প্রক্রিয়া দুভাবে বিভক্ত। নতুন শাখা, উপশাখা, কালেকশন বুথ এবং ফরেন কারেন্সি এক্সচেঞ্জ বুথ স্থাপনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘নীতিগত অনুমোদন’ ও পরবর্তীতে ‘চূড়ান্ত অনুমোদন’ নিতে হবে। বিদ্যমান ব্যবসা কেন্দ্র একীভূতকরণ, রূপান্তর বা বন্ধ করার জন্যও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমতি আবশ্যক। তবে ইলেকট্রনিক বুথ (এটিএম, সিআরএম, সিডিএম), এক মাসের কম সময়ের অস্থায়ী বুথ এবং বিমানবন্দর লাউঞ্জ স্থাপনে ব্যাংকের নিজস্ব পরিচালনা পর্ষদ বা নির্বাহী কমিটির অনুমোদনই যথেষ্ট। সেক্ষেত্রে এক সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করতে হবে।
ভাড়া ও অগ্রিম প্রদানের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর অবস্থান নিয়েছে। নির্ধারিত সীমার মধ্যে থাকা সাপেক্ষে আয়তন বাড়ানো বা চুক্তি নবায়নের জন্য ব্যাংক নিজস্ব পর্ষদের অনুমোদন নিতে পারবে। তবে কোনো এলাকার বিদ্যমান ভাড়ার চেয়ে অস্বাভাবিক বেশি ভাড়ায় জায়গা নেওয়া যাবে না। ভবনমালিককে মাসিক ভাড়ার সঙ্গে সমন্বয়যোগ্য অগ্রিম প্রদান করা হলে তা চুক্তির মেয়াদ অনুযায়ী ১৮ থেকে ৩০ মাসের ভাড়ার সমান হতে পারবে। আর ফেরতযোগ্য নিরাপত্তা জামানত হিসেবে সর্বোচ্চ ছয় মাসের ভাড়ার সমান অগ্রিম দেওয়া যাবে। কোনো ব্যাংকের পরিচালক বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মালিকানাধীন ভবন ভাড়া নিতে হলে তা আবেদনে উল্লেখ করতে হবে এবং একই এলাকার অন্য ভবনের তুলনায় ভাড়া বেশি হওয়া যাবে না।
অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জার ব্যয়ও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। নতুন ব্যবসা কেন্দ্র স্থাপনে প্রতি বর্গফুটে সর্বোচ্চ ২ হাজার ২০০ টাকা ব্যয় করা যাবে। স্থানান্তরিত কেন্দ্রের ক্ষেত্রে এই সীমা প্রতি বর্গফুটে ১ হাজার ৬০০ টাকা। শহর ও পল্লি শাখার ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্যাংকগুলোকে ৫০:৫০ অনুপাত মেনে চলতে হবে। অর্থাৎ এক বছরে যত শাখা খোলা হবে, তার অর্ধেক পল্লি অঞ্চলে হতে হবে। একই শহরে এক বছরে একাধিক শাখা খোলা যাবে না। পল্লি অঞ্চলের শাখা শহরে স্থানান্তর করাও নিষিদ্ধ।
সান্ধ্য ব্যাংকিংয়ের সময় স্বাভাবিক ব্যাংকিংয়ের চেয়ে সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা বেশি হতে পারবে, তবে এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি লাগবে। সন্ধ্যায় কেবল নগদ জমা নেওয়া যাবে, অন্য কোনো লেনদেন নয়। নীতিমালা লঙ্ঘনে বড় অঙ্কের জরিমানার বিধান রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ভুল তথ্য দিয়ে অনুমোদন নিলে বা নিয়মবহির্ভূত শাখা স্থানান্তর করলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায় কেন্দ্রের অনুমোদন বাতিল করতে পারবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই সমন্বিত নীতিমালার ফলে ব্যাংকগুলোর অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাস এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে আধুনিক ব্যাংকিং সেবার প্রসার ঘটবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।




