বর্তমান সুদের হারভিত্তিক মুদ্রানীতি কাঠামো থেকে ধাপে ধাপে বেরিয়ে এসে মূল্যস্ফীতিকে কেন্দ্র করে একটি লক্ষ্যভিত্তিক কাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দৃষ্টিতে, বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার ক্ষেত্রে মুদ্রানীতির কার্যকারিতা হবে সবচেয়ে নির্ণায়ক। যদিও এখন সুদের হার সমন্বয়ের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি দমনের চেষ্টা চলছে, তবে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির পথে এই পদ্ধতি থেকে বিদায় নিতে হবে এবং মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যভিত্তিক মুদ্রানীতি কাঠামো জরুরি। এ লক্ষ্যে ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারকে আরও সময়োপযোগী করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতা বৃদ্ধির কথাও বলা হয়েছে।
রোববার জাতীয় সংসদ ভবনে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে লিখিত বক্তব্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে। বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান 'বাংলাদেশ ব্যাংক এবং মুদ্রানীতি' শিরোনামে একটি ছয় পৃষ্ঠার প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে আয়োজিত সভায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং বিএনপির সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেনসহ অন্যান্য সদস্যরা অংশ নেন। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক, এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব ও ইআরডি সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকীও উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, প্রায় সব সংসদ সদস্যই সুদের হার অতিরিক্ত বেশি বলে প্রশ্ন তুলেছেন এবং মূল্যস্ফীতি না কমার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে প্রথম বৈঠক হওয়ায় সময়ের স্বল্পতার কারণে বিস্তরিত আলোচনা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের প্রতিবেদনে মুদ্রানীতির বিবর্তন তুলে ধরে। ২০০৩ সাল থেকে অর্থের জোগানভিত্তিক কাঠামো অনুসরণ করার পর বিশ্ব অর্থনীতির গতিবিধি ও আর্থিক উদ্ভাবনের প্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের জুলাই থেকে সুদের হারভিত্তিক এই নতুন কাঠামো চালু হয়। বর্তমানে সুদের হার করিডোরের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেবল নীতি সুদহারই যথেষ্ট নয়, বিনিময় হার ও সরকারের রাজস্ব নীতির সমন্বয়ও একান্ত আবশ্যক।
প্রসঙ্গত, টানা তৃতীয় মাসের মত দেশে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ঘরে রয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুনে পয়েন্ট টু পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.১৬ শতাংশ। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, সরবরাহ শৃঙ্খলোর দুর্বলতা ও উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি-প্রত্যাশা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে বলে জানায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পাশাপাশি সরকার ঘোষিত ৬৩ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন উৎপাদন বাড়ালেও তা মূল্যস্ফীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলেও মন্তব্য করা হয়।
মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যভিত্তিক কাঠামো বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, এ কাঠামোতে সুদের হার নিজে লক্ষ্য নয়, বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি নির্দিষ্ট মূল্যস্ফীতি হার অর্জনের ঘোষণা দেবে। উদাহরণ স্বরূপ, আগামী দুই বছরে মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য ঠিক করা হলে তারল্য, সুদের হার এবং বিনিময় হার—সবকিছু সেই লক্ষ্য পূরণের মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে। তবে এই রূপরেখা বাস্তবায়নের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত স্বায়ত্তশাসন, মূল্যস্ফীতি পূর্বাভাসের সক্ষমতা এবং রাজস্ব নীতির সাথে সঙ্গতির প্রয়োজন রয়েছে।
বৈঠকে বিএনপির এমপি শাহাদাত হোসেন খেলাপি ঋণ হ্রাস করে উৎপাদনমুখী খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে জুন মাসের প্রজ্ঞাপনে ব্যবসায়ীদের এককালীন পরিশোধের যে সময়সীমা ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেওয়া হয়েছিল, তা আরও ছয় মাস বাড়ানোর দাবি জানান। তিনি অভিযোগ করেন, 'ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের' জটিলতায় ব্যাংকগুলো ব্যবসায়ীদের হয়রানি করছে। পাশাপাশি তিনি সুদের হার এক অংকে নামিয়ে আনার ওপর জোর দিয়ে বলেন, প্রচলিত উচ্চ সুদে ব্যবসা পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।




