চাকরির সন্ধান আর গবেষণার নানা সম্ভাবনা খুঁজতে খুঁজতেই হঠাৎ এক শিক্ষকের ডাক পেলেন মাস্টার্স শেষ করা এক তরুণ গবেষক। অ্যারিজোনা থেকে নিউ মেক্সিকোর প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত হর্নাডা এক্সপেরিমেন্টাল রিসার্চ রেঞ্জে এক মাসের কাজের সুযোগ ছিল সেটি। সাড়ে ৫০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্ব পাড়ি দিতে বেছে নেওয়া হয় বাসযাত্রা, যা ছিল তার জীবনের প্রথম দীর্ঘ বাস জার্নি।
১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই গবেষণাকেন্দ্রটি প্রায় ৭৮৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। উত্তর আমেরিকার বিখ্যাত চিহুয়াহুয়ান মরুভূমির এই অঞ্চলে মার্কিন কৃষি বিভাগ ও নিউ মেক্সিকো স্টেট ইউনিভার্সিটি যৌথভাবে জলবায়ু পরিবর্তন, মরুকরণ রোধ এবং চারণভূমি ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা করে আসছে। সেখানে পোস্ট-ডক গবেষক এলেককে ফিল্ডে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা সেটআপ ও তথ্য সংগ্রহে সহায়তা করার কথা ছিল তার।
গুগলে জায়গাটি সম্পর্কে আগে থেকেই নানা রোমাঞ্চকর তথ্য জেনে নিয়েছিলেন তিনি। তবে বাস থেকে নামার পর এলেক তাকে নিতে এলে বোঝা যায়, মূল গবেষণা এলাকায় পৌঁছাতে আরও দেড় ঘণ্টার ড্রাইভ বাকি। অননুমোদিত যানবাহন চলাচল কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ওই এলাকায়। পথে এলেক স্থানীয় বন্যপ্রাণী সম্পর্কে বলছিলেন—র্যাটলস্নেক, বিশাল গিরগিটি আর বড় বড় কাঁটাযুক্ত ক্যাকটাসের কথা। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর কাঁচা রাস্তা শুরু হলে গাড়ির গতি কমে দাঁড়ায় মাত্র ২৫ কিলোমিটারে। ঝাঁকুনিতে ভরা সেই পথ পাড়ি দিতে দিতে যুক্তরাষ্ট্রে এমন দুর্গম রাস্তা থাকতে পারে—তা মেনে নিতেই কিছুটা সময় লেগে যায়।
পথে এক নিঃসঙ্গ কুকুরের দেখা মেলে। এলেক জানান, আগের দিনও একই জায়গায় তাকে দেখেছেন তিনি। এরপর অ্যানিমেল কন্ট্রোলকে ফোন করা হলে আধা ঘণ্টা পর তাদের গাড়ি আসে। ঝোপের ভেতর থেকে আরেকটি কুকুর বেরিয়ে এলে দুই কুকুরকে সামলাতে বনকর্মীদের হিমশিম অবস্থা। ফোনে আরেক সহকর্মীকে ডেকে আনা হয়, আরও ১০ মিনিট পর এসে দুজনে মিলে কুকুর দুটিকে উদ্ধার করে নিয়ে যান।
প্রায় আরও বিশ মিনিট পর ট্রেইলার হাউসে পৌঁছে চারপাশের পরিবেশ দেখে মনে হয়েছিল—যেন কল্পনার কোনো ক্যানভাস। সেদিন ছিল ২৯ জুন, ২০২৬, ভরা পূর্ণিমার রাত। ঝিঁঝি পোকার ডাক, ডানা মেলে থাকা ইউকা গাছ আর ছায়াবৃত পাহাড়—চাঁদের আলোয় মরুভূমি দেখে মনে হচ্ছিল কোনো অপার্থিব জগতে পা রেখেছেন তিনি।
পরদিন সকাল ছয়টায় ফিল্ডে গিয়ে দেখা যায় বিশাল রিসার্চ সাইট। সেদিন ইউসিএলএ-র মাস্টার্সের শিক্ষার্থীদের সহায়তা করার কথা ছিল। সকালের মরুভূমির পরিবেশ ছিল চমৎকার, কিন্তু সকাল নয়টা বাজতেই রোদ চড়চড় করে বেড়ে যায়। কড়া রোদে বালুতে কাজ করতে গিয়ে বারবার মনে হচ্ছিল দেশের কৃষকেরা কত কষ্ট করে এই রোদে ফসল ফলান। এখানে মূলত ইউএসডিএর অর্থায়নে জলবায়ু ও মাটি-সংক্রান্ত প্রকল্প চলে, যেখানে দেশটির স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা কার্বন নিঃসরণ, সেচব্যবস্থা, মাটির কার্বন ও নাইট্রোজেনের ভারসাম্য নিয়ে কাজ করেন। পদ-ভেদাভেদ ভুলে সবার নিষ্ঠার সঙ্গে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের দৃশ্য ছিল সবচেয়ে সুন্দর।
দুপুর ১২টায় ট্রেইলারে ফিরে তপ্ত রোদের ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়তেন তিনি। বিকেল পাঁচটায় আবার সাইটে যাওয়া, রাতে আটটায় ফিরে গভীর ঘুম—টানা এক মাসের রুটিন ছিল এমনই। এরই মধ্যে খবর পেয়ে যোগাযোগ করেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বড় ভাই, যিনি পরিবার নিয়ে কাছাকাছি শহরে থাকেন। তার বাসায় গিয়ে যেন একটুকরা বাংলাদেশ খুঁজে পান—বাংলায় কথা, দেশি খাবারের স্বাদ আর চেনা আতিথেয়তায় মন ভরে যায়। ভাইয়াদের সঙ্গে ঘুরতে যান হোয়াইট স্যান্ড ন্যাশনাল পার্কে। টুলারোসা বেসিনে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম জিপসাম বালিয়াড়ির এই প্রান্তরে তুষারের মতো সাদা বালু আর পানিতে ভিজলে সিমেন্টের মতো জমে যাওয়ার ঘটনা তাঁকে মুগ্ধ করে।
হেডকোয়ার্টারে ফেরার দিন ছিল ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ (১৯ জুলাই)। সারাদিন ভাইদের বাসায় খেলা উপভোগ করে সন্ধ্যায় ফেরার পথে ওয়েদার আপডেটে দেখা যায় ‘ফ্ল্যাশ ফ্লাড’ সতর্কতা। পাহাড়ের উপত্যকা দিয়ে বৃষ্টির পানি তীব্র বেগে নেমে পথঘাট ভাসিয়ে দেওয়ার শঙ্কা। কিছুদূর যেতেই চারপাশ পানিতে থইথই। এলেককে ফোন করে জানালে সে ল্যাব থেকে ফোর-হুইল ড্রাইভ ট্রাক নিয়ে উদ্ধারে আসে। কিন্তু আসার পথেই পানির তোড়ে ট্রাকের ইঞ্জিনে পানি ঢুকে গাড়ি বন্ধ হয়ে যায়। হাঁটুপানিতে নেমে এলেকের সঙ্গে গাড়ি ঠেলে রাস্তার এক কোনায় নিতে হয়। ছোটবেলায় ওয়েস্টার্ন সিনেমায় দেখা দৃশ্য নিজেই যেন অভিনয় করলেন তিনি।
ফেরার কোনো যানবাহন অবশিষ্ট নেই জেনে প্রফেসর ইউএসডিএর অফিসে জরুরি কল করে একটি রাইডের ব্যবস্থা করেন। তখন প্রায় সন্ধ্যা, রাত আটটার দিকে সূর্য ডোবে এখানে। পাহাড় থেকে নেমে আসা স্রোতের গর্জন আর ঝিঁঝি পোকার শব্দে সুনসান নীরবতা। অপেক্ষার সেই অন্ধকারে এলেক বাংলাদেশ সম্পর্কে জানতে চান—দেশের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য, ইতিহাস, নকশিকাঁথার রূপ, পুরান ঢাকার সাকরাইন উৎসব, বাংলার ঝুম বৃষ্টি আর জোনাক পোকার গল্প। গল্পের মাঝেই দূরে গাড়ির আলোর ঝলকানি দেখা যায়। অবশেষে অপেক্ষার অবসান। সেই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে লেখক মনে করেন, কাজী আনোয়ার হোসেনের মাসুদ রানা সিরিজের কোনো ওয়েস্টার্ন উপন্যাসের পাতা থেকে যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছেন নিজেই। জীবনে তেমন বেশি চাওয়ার কিছু নেই—এমন কিছু খাঁটি আনন্দ আর রোমাঞ্চ স্মৃতির থলেতে জমা করতে পারাই জীবনকে সুন্দর করে তোলে বলে মনে করেন তিনি।




