জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পার হলেও তার চেতনা বাস্তবায়নের পথে অগ্রগতি সীমিত বলে মন্তব্য করেছেন অভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক ও নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক প্রাপ্তি তাপসী। সম্প্রতি এক লেখায় তিনি অভ্যুত্থানের স্মৃতি ও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তাঁর মতে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে লাখো মানুষ যে বৈষম্য, অন্যায় ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিলেন, সেই স্বপ্ন পূরণের পথে এখনো অনেক দূর যেতে হবে।
প্রাপ্তি তাপসী জানান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমে ছাত্রলীগ, পরে পুলিশ বাহিনী তাদের ওপর হামলা চালায় এবং হল খালি করে দেয়। অনেক শিক্ষার্থী হল ছাড়তে বাধ্য হলেও কয়েকজন ছাত্রী প্রতিবাদস্বরূপ হলে অবস্থান করেন। বিদ্যুৎ, খাবার ও পানি ছাড়া অন্ধকার রাতগুলোয় তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ও হলের খালারা, যাঁরা কোনো স্বার্থ ছাড়াই ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি ৩ আগস্ট রাতের ঘটনা স্মরণ করে বলেন, ছাত্রলীগ-যুবলীগের আক্রমণের সময় এক নারী রিকশাচালক তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দেন। ৪ আগস্ট দুপুরে কাঁটাবন মোড়ে পুলিশের গুলি ও কাঁদানে গ্যাসের শেলের মুখে এক মা তাঁর মেয়েকে নিয়ে এগিয়ে এসে খাবার ও পানি দেন এবং প্রয়োজনে নিজের বাসায় আসার আমন্ত্রণ জানান।
তিনি উল্লেখ করেন, জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সাধারণ মানুষ—শিক্ষার্থী, শ্রমিক, রিকশাচালক, হকার, দিনমজুর, গৃহিণী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, শিল্পী, শিক্ষক, এমনকি পথচারীরাও কোনো না কোনোভাবে এই লড়াইয়ের অংশ হয়েছিলেন। যাঁরা কখনো সংবাদপত্রের শিরোনাম হননি, তাঁদের ছবি ইতিহাসের বইয়ে স্থান পাবে না, তারাও জুলাইকে নিজেদের কাঁধে বহন করেছেন। জুলাই ছিল জনগণের সম্মিলিত সাহসের প্রতিচ্ছবি, যা প্রমাণ করে ক্ষমতার সবচেয়ে বড় উৎস শেষ পর্যন্ত জনগণই।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসকে সংকুচিত করার চেষ্টা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। একটি গণ-অভ্যুত্থানকে কয়েকটি ব্যক্তির বীরত্বের গল্পে পরিণত করার চেষ্টা হয়েছে, মানুষের অংশগ্রহণকে ছোট করে দেখা হয়েছে, নারীদের অবদানকে প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, শ্রমজীবী, লিঙ্গবৈচিত্র্যের মানুষ, প্রান্তিক মানুষের অভিজ্ঞতা ইতিহাসের মূল বয়ান থেকে বাদ পড়তে শুরু করেছে। তিনি মনে করেন, যেকোনো গণ-অভ্যুত্থানের শক্তি তার বহুত্বে এবং সেই বহুত্বকে মুছে ফেলা মানে জুলাইকেই অস্বীকার করা।
প্রাপ্তি তাপসী আরও বলেন, কোনো গণ-অভ্যুত্থান শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনের মাধ্যমে টিকে থাকে না। রাষ্ট্র যদি পুরোনো অভ্যাসেই ফিরে যায়, তাহলে সেটিই শহীদদের রক্তের সঙ্গে সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা। তিনি সত্য রক্ষা, দলীয় স্বার্থের কাছে সত্য না বিকানো, সংখ্যাগরিষ্ঠের বয়ানের কাছে অভ্যুত্থানের চেতনা আত্মসমর্পণ না করা, বিচারকে রাজনৈতিক সমঝোতার কাছে বিসর্জন না দেওয়া, গণতন্ত্রকে শুধু স্লোগান হিসেবে না ব্যবহার করা এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্নকে বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না রাখার আহ্বান জানান।
তিনি বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সরকারের দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দেন। বহু বছর পর দেশের মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছেন, কিন্তু এখনো বিত্তশালীদের অপরাধ ধরাছোঁয়ার বাইরে, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নাগরিকরা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার, শিল্পীরা আক্রমণের মুখে, লৈঙ্গিক বৈষম্য ও সহিংসতার বিচার পেতে বছরের পর বছর লেগে যায়। তাঁর মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান থেকে বর্তমান নীতিনির্ধারকেরা যত দ্রুত শিক্ষা নেবেন, ততই মঙ্গল। মানুষের জুলাইকে মানুষের কাছে ফিরিয়ে দেওয়াই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।




