বাংলাদেশে স্বাস্থ্য গবেষণার গুরুত্ব নিয়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা থাকলেও মাঠপর্যায়ে এর কার্যকর প্রয়োগ সীমিত বলে মত প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ‘আমাদের গ্রাম’ ক্যানসার কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের প্রতিষ্ঠাকালীন পরিচালক রেজা সেলিমের মতে, দেশের স্বাস্থ্য গবেষণা পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ হলো মাঠভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা, নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ এবং গবেষণার মধ্যে কার্যকর সংযোগের অভাব।

দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি ইলেকট্রনিক তথ্যব্যবস্থার আওতায় আসেনি। বিভিন্ন হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক রোগী সেবা নিলেও তাদের রোগের ইতিহাস, চিকিৎসা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি সম্পর্কে সমন্বিত তথ্য সংরক্ষিত হচ্ছে না। এ কারণে কোন অঞ্চলে কোন রোগ বাড়ছে, কোন বয়সের মানুষ বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন, বা কোন চিকিৎসা কার্যকর—এসব বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় না। সঠিক স্বাস্থ্য প্রোফাইল ছাড়া কার্যকর পরিকল্পনা ও নীতি প্রণয়ন সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান নিয়মিত গবেষণা পরিচালনা করলেও তাদের ফলাফল প্রায়শই একাডেমিক প্রকাশনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী, হাসপাতাল ব্যবস্থাপক ও নীতিনির্ধারকদের কাছে সেই তথ্য পৌঁছায় না। অন্যদিকে, যারা প্রতিদিন রোগীদের সরাসরি সেবা দিচ্ছেন, তাদের অভিজ্ঞতা গবেষণার প্রশ্ন নির্ধারণে খুব কমই ব্যবহৃত হয়। ফলে গবেষণার বিষয়বস্তু বাস্তব সমস্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না।

রেজা সেলিম তাঁর প্রায় ৩০ বছরের রামপালভিত্তিক ‘আমাদের গ্রাম’ স্বাস্থ্য কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, গবেষণার সূচনা স্থানীয় সমস্যা বোঝার মধ্য দিয়ে হওয়া উচিত। স্থানীয় মানুষ কী ধরনের রোগে ভুগছেন, চিকিৎসাসেবা নিতে তাদের কী বাধা, রোগ সম্পর্কে তাদের ধারণা, অর্থনৈতিক অবস্থা ও পরিবেশগত পরিবর্তন কীভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে—এসব বুঝতে হবে। মাঠ থেকে সংগৃহীত তথ্য শুধু গবেষণাপত্রের জন্যই নয়, বরং স্থানীয় স্বাস্থ্য-পরিকল্পনা ও জাতীয় নীতিতে পরিবর্তন আনতে ব্যবহার করা সম্ভব।

তিনি বিশেষভাবে অসংক্রামক রোগ (এনসিডি) নিয়ন্ত্রণে তথ্যের গুরুত্বের ওপর জোর দেন। হৃদরোগ, ক্যানসার, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগ ও দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগ বাংলাদেশে ক্রমে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হয়ে উঠছে। এসব রোগের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। একজন মানুষের বয়স, ওজন, রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, পারিবারিক ইতিহাস, খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান, পেশা ও পরিবেশের তথ্য দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা গেলে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার সুযোগ তৈরি হয়। হাজার হাজার মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী চিহ্নিত করা সম্ভব।

তবে তথ্য সংগ্রহ করলেই হবে না; এর মান, গোপনীয়তা, নিরাপত্তা ও নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, তথ্যবিজ্ঞানী, বিশ্ববিদ্যালয় ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা দরকার। রেজা সেলিমের মতে, বাংলাদেশে একটি সমন্বিত স্বাস্থ্য গবেষণা কাঠামো প্রয়োজন, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় পদ্ধতিগত দক্ষতা, মাঠপর্যায়ের প্রতিষ্ঠান বাস্তব তথ্য, প্রযুক্তিবিদরা ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য তথ্যব্যবস্থা এবং সরকার নীতিতে গবেষণার ফল ব্যবহার করবে।

গ্রামীণ বাংলাদেশকে শুধু গবেষণার নমুনা সংগ্রহের জায়গা নয়, বরং গবেষণার অংশীদার হিসেবে দেখা উচিত। স্থানীয় সমস্যা ও অভিজ্ঞতা গবেষণার বিষয় নির্ধারণে প্রতিফলিত হতে হবে এবং ফলাফল তাদের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে ব্যবহার করতে হবে। স্বাস্থ্য গবেষণা তখনই অর্থবহ হবে, যখন এর ফল দেশের সবচেয়ে অবহেলিত মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলবে। গবেষণাপত্র ও সেমিনার গুরুত্বপূর্ণ হলেও, তা যদি গ্রামের দরিদ্র রোগীর রোগ প্রতিরোধ বা মানসম্মত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ না বাড়ায়, তাহলে সেই গবেষণার সামাজিক মূল্য সীমিত।

তিনি আশা প্রকাশ করেন যে নীতিনির্ধারণী মহল বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখবে এবং যথাযথ উদ্যোগ নেবে। বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলে বাস্তবভিত্তিক স্বাস্থ্যতথ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে এবং স্থানীয় সমস্যা থেকে গবেষণার প্রশ্ন তৈরি করে ফল আবার জনগণের কল্যাণে ফিরিয়ে দিতে হবে।