আইনকে ন্যায়বিচারের প্রতিকার হিসেবে নয়, বরং একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশেই প্রকট। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, বর্তমানে ৪০ লাখের অধিক মামলা আদালতে ঝুলে আছে, যেখানে বিপরীত চিত্র দেখা যায় সুইডেনে। উত্তর ইউরোপের এই কল্যাণমূলক রাষ্ট্রটিতে গড়ে একটি দেওয়ানি মামলার নিষ্পত্তি ঘটে মাত্র ছয় মাসে। এই বিপরীতমুখী বাস্তবতা একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে: আইন কি শোষণের অস্ত্র হবে, না কি ন্যায়ের আশ্রয়স্থল?
বাংলাদেশে আইনের অপব্যবহারের অসংখ্য দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে রয়েছে। পারিবারিক সম্পদ বণ্টনের বিরোধ, প্রতিবেশীর সঙ্গে মনোমালিন্য, রাজনৈতিক মতভেদ অথবা অবৈধ সম্পত্তি দখলের অভিপ্রায়—এসব নানা কারণে হামেশাই ভিত্তিহীন মামলা দায়ের করা হচ্ছে। স্বয়ং আইনমন্ত্রী সংসদে তথ্য দিয়ে জানিয়েছেন যে লাখো মিথ্যা ও ভিত্তিহীন মামলা বছরের পর বছর আদালতে আটকে আছে। এসব অপ্রয়োজনীয় মামলার ভিড়ে প্রকৃত ও জরুরি মামলাগুলোর সময়মতো বিচার সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলস্বরূপ, অগণিত মানুষ দীর্ঘসূত্রিতার শিকার হয়ে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এই সংকট নিরসনে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সামাজিক সচেতনতার সমন্বয় প্রয়োজন। একই সঙ্গে, উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর আইনি কাঠামো বিশ্লেষণ করে তা বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রয়োগের কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। সে লক্ষ্যে সুইডেনের আইনকানুন ও তার প্রায়োগিক দিক একটি শক্তিশালী উদাহরণ হিসেবে কাজ করতে পারে।
সুইডেনের আইনি কাঠামো চারটি মৌলিক আইনের সমন্বয়ে গঠিত সংবিধানের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। দেশটির আইন প্রণয়নের দায়িত্ব সংসদের (রিকসডাগ) এবং বাস্তবায়নের ভার সরকারের হাতে। সুইডিশ ব্যবস্থার এক অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো চরম স্বচ্ছতা। ‘পাবলিক অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন’ নীতির আওতায় সরকারি তথ্য সাধারণ নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত, যা দুর্নীতি হ্রাস ও জনগণের আস্থা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখে। বিচারব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ, যেখানে জেলা আদালত, আপিল আদালত ও সুপ্রিম কোর্ট—এই তিন স্তরের কাঠামো বিদ্যমান। বিচারকেরা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে দ্রুত ও কার্যকরভাবে মামলা পরিচালনা করেন।
আইনের অপব্যবহার রুখতে সুইডেনের রয়েছে বেশ কিছু শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি। ওমবাডসম্যান ব্যবস্থার মাধ্যমে সংসদের অধীনে একটি সংস্থা সরকারি কর্মকর্তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে এবং নাগরিকেরা সরাসরি ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ জানাতে পারেন। প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের অধিকার ও স্বাধীন গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাও ক্ষমতার অপব্যবহার প্রতিরোধ করে। পুলিশ ও সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য কঠোর পেশাগত নৈতিকতা ও প্রশিক্ষণ বলবৎ রয়েছে এবং অনিয়মের ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
এসবের মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো দেওয়ানি মামলায় ‘লুজার পেজ’ (Loser Pays) বা ‘পরাজিত পক্ষ খরচ বহন করবে’ নীতি। এই নিয়ম অনুযায়ী, মামলায় হেরে যাওয়া পক্ষকে নিজের খরচ ছাড়াও বিজয়ী প্রতিপক্ষের যুক্তিসংগত আইনি খরচ, যেমন আইনজীবীর ফি ও আদালতের খরচ বহন করতে হয়। এর ফলে অপ্রয়োজনীয়, দুর্বল বা প্রতিশোধপরায়ণ মামলা দায়ের করার আগে বাদীকে গভীরভাবে ভাবতে হয়। তবে ব্যতিক্রমও রয়েছে: ছোটখাটো দাবির ক্ষেত্রে এই নিয়ম শিথিল থাকে, যাতে সাধারণ নাগরিক আদালতে যেতে নিরুৎসাহিত না হন। দরিদ্র ব্যক্তিদের জন্য সরকারি আইনি সহায়তা ও বাসস্থান-বিমার মাধ্যমে আইনি ব্যয়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়। সুইডেনের এই নীতি ও কঠোর জবাবদিহির সংস্কৃতি বিচারব্যবস্থাকে সুশৃঙ্খল রাখার একটি চমৎকার মাধ্যম, যা একইসঙ্গে মিথ্যা মামলার জট কমায় এবং অন্যায়ভাবে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আর্থিক সুরক্ষা দেয়। বাংলাদেশের বিচার বিভাগের জটিলতা কমাতে এই যুগোপযোগী পদ্ধতিগুলো গভীর বিশ্লেষণ ও অনুকরণের দাবি রাখে।
সুইডেনের শাস্তি ব্যবস্থাও কেবল দণ্ড দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি অপরাধীর সামাজিক পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করে। বন্দীদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তনের পথ তৈরি করা হয়। সেখানে মৃত্যুদণ্ড সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং মূলত কারাদণ্ড, জরিমানা বা সমাজসেবামূলক কাজের মাধ্যমে দণ্ড কার্যকর করা হয়।


