জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির প্রথম মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন প্রকাশের তিন দশকেরও বেশি সময় পর, এর স্থপতি মাহবুব উল হকের জীবন ও দর্শন আজও সমান প্রাসঙ্গিক। অর্থনীতিবিদ সেলিম জাহান প্রয়াত এই দূরদর্শীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লিখেছেন, মাহবুব উল হক কেবল মানব উন্নয়ন ধারণার জন্মই দেননি, বরং আমৃত্যু এর অন্যতম প্রধান প্রবক্তা হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর মতে, 'চূড়ান্ত বিচারে মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত হয় তার নিজের চয়িত কর্মকাণ্ডে, কেবল ভাগ্যচালিত ঘটনায় নয়' — এই বিশ্বাসই ছিল হকের জীবন ও কর্মের মূলভিত্তি।
একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া মাহবুব উল হক উপমহাদেশের বিভাজনের গণহত্যা প্রত্যক্ষ করেছিলেন এবং সদ্যস্বাধীন দেশগুলোর নাজুক অবস্থার মধ্যে বেড়ে উঠেছিলেন। তবু তিনি ভাগ্যকে কখনোই নিজের পথের নিয়ন্ত্রক হতে দেননি। তিনি সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা ও বিদ্বেষের ঘোর বিরোধী ছিলেন এবং 'জীবনের সুযোগের সমতা'র পক্ষে গভীর আবেগ নিয়ে সোচ্চার থেকেছেন। তাঁর বিকশিত মানব উন্নয়নের মূল ভিত্তি এই দর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে যে, একটি জাতির প্রকৃত সম্পদ হলো তার মানুষ; উন্নয়নের চূড়ান্ত লক্ষ্য এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা, যেখানে মানুষ দীর্ঘ, সুস্থ ও সৃজনশীল জীবন যাপন করতে পারে।
এই ধারণা অনুযায়ী উন্নয়ন একই সঙ্গে প্রক্রিয়া ও ফলাফল। এটি যেমন মানুষের সক্ষমতা ও বিকল্পের পরিধি সম্প্রসারণের ওপর জোর দেয়, তেমনি সেই সুযোগের বাস্তব প্রতিফলনেও সমান গুরুত্ব আরোপ করে। মাহবুব উল হক তিনটি মৌলিক বিষয়ের ওপর বিশেষভাবে আলোকপাত করতেন: সক্ষমতা ও সুযোগের মধ্যে ভারসাম্য, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে কেবল উপকরণ হিসেবে গণ্য করা (কখনোই চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়), এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি পর্যায়ে মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। তাঁর ভাষায়, মানব উন্নয়ন হলো 'মানুষের উন্নয়ন, মানুষের জন্য উন্নয়ন এবং মানুষের দ্বারা উন্নয়ন'।
১৯৯০ সালে তাঁর নেতৃত্বে প্রকাশিত প্রথম মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন বিশ্বের উন্নয়ন-ভাবনায় এক নীরব বিপ্লব ঘটায়। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, মানব উন্নয়নের বিস্তৃত তথ্য-উপাত্তের পাশাপাশি একটি সহজবোধ্য সমন্বিত পরিমাপক থাকা জরুরি; অন্যথায় মোট মাথাপিছু আয়ের একক আধিপত্য কখনোই ভাঙবে না। এই চিন্তা থেকেই জন্ম নেয় বিশ্বখ্যাত মানব উন্নয়ন সূচক। এই সূচকে চারটি নির্ণায়ক স্থান পেয়েছিল: জন্মকালীন প্রত্যাশিত আয়ু, প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষরতার হার ও শিক্ষার সম্মিলিত ভর্তির হার, এবং ক্রয়ক্ষমতা সমতা সমন্বিত মাথাপিছু প্রকৃত আয়। তিনি স্বীকার করতেন, এই সূচক মানব উন্নয়নের পূর্ণাঙ্গ পরিমাপক নয়; এটি গড়ভিত্তিক হওয়ায় অভ্যন্তরীণ বৈষম্য আড়াল করে এবং স্বল্পমেয়াদি অর্জনকে যথাযথভাবে ধরতে পারে না। কিন্তু এর মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো উন্নয়নের মানদণ্ড হিসেবে আয়ের একচ্ছত্র আধিপত্য ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়।
মাহবুব উল হকের দূরদর্শী চিন্তার আরেকটি মাইলফলক ছিল ১৯৯৫ সালের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন, যা নিবেদিত হয়েছিল নারী-পুরুষ সমতার প্রতি। তিনি বিশ্বাস করতেন, নারীর দৃষ্টিভঙ্গি ও স্বার্থকে বাদ দিয়ে কোনো উন্নয়নই প্রকৃত অর্থে উন্নয়ন হতে পারে না। ওই প্রতিবেদনে নারীদের অবৈতনিক শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্যায়নের পাশাপাশি দুটি যুগান্তকারী সূচক — নারী-পুরুষ-সম্পর্কিত উন্নয়ন সূচক এবং নারীর ক্ষমতায়ন পরিমাপক — চালু করা হয়, যা নারী-পুরুষ অসমতা মূল্যায়নের দৃষ্টিভঙ্গি মৌলিকভাবে বদলে দেয়।
নীতিনির্ধারণী দিকেও তাঁর অবদান ছিল গভীর। তিনি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ২০:২০ প্রস্তাব উত্থাপন করেন, যেখানে দেশীয় সম্পদ ও উন্নয়ন সহায়তার ২০ শতাংশ মৌলিক সামাজিক সেবায় ব্যয়ের কথা বলা হয়। এছাড়া টোবিন কর পুনরুজ্জীবিত করা, শান্তির লভ্যাংশ বিনিয়োগের আহ্বান এবং বৈশ্বিক মানব উন্নয়ন তহবিল গঠনের মতো সাহসী প্রস্তাব তিনি রেখেছিলেন। ১৯৯৩ সালের প্রতিবেদনে 'কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি' এবং ১৯৯৪ সালের প্রতিবেদনে 'মানব নিরাপত্তা'র ধারণা প্রবর্তন করে তিনি উন্নয়ন ও নিরাপত্তার প্রচলিত সংজ্ঞাই পাল্টে দেন, যেখানে রাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারের চেয়ে মানুষের খাদ্য, স্বাস্থ্য, আয় ও পরিবেশগত নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
মাহবুব উল হক বিশ্বাস করতেন ইতিহাসের আসল চালিকা শক্তি হলো ধারণা, বিপ্লব আসে তার পরে। তাঁর মতে, প্রতিটি নতুন ধারণা তিনটি ধাপ পেরোয় — প্রথমে সংগঠিত প্রতিরোধ, তারপর ব্যাপক কিন্তু সমালোচনাহীন গ্রহণযোগ্যতা, এবং শেষে সমালোচনামূলক মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে বাস্তব প্রয়োগ। তাঁর এই বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্যোগের সুদূরপ্রসারী প্রভাব সুস্পষ্ট: বর্তমানে ১২০টিরও বেশি দেশে প্রায় ৯০০টি জাতীয় মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, যা নীতিনির্ধারণ, জনসচেতনতা গঠন ও একাডেমিক গবেষণার অপরিহার্য হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ, কলম্বিয়া, ঘানা ও পাকিস্তান—এই মাত্র চারটি দেশ পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় প্রতিবেদন প্রকাশের যে যাত্রা শুরু করেছিল, তা আজ এক বৈশ্বিক আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।
ব্যক্তি মাহবুব উল হক ছিলেন অসাধারণ মানবিক গুণের অধিকারী। ভদ্র, মৃদুভাষী ও উদার এই মানুষটির কোমল স্বভাবের আড়ালে লুকিয়ে ছিল অনন্য দৃঢ়তা, অধ্যবসায় ও চারিত্রিক শক্তি। তিনি জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও সততাকে জীবনের সর্বোচ্চ মূল্য দিতেন এবং সন্তানদের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন, 'জ্ঞান হোক তোমাদের তরবারি, আর প্রজ্ঞা হোক তোমাদের ঢাল'। টি এস এলিয়টের 'ডু উই ডেয়ার' এবং রবার্ট ফ্রস্টের 'দ্য রোড নট টেকেন' ছিল তাঁর প্রিয় কবিতা—যেখানে কম পাড়ি দেওয়া পথের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার প্রতি গভীর আস্থা ফুটে ওঠে।
তিনি এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতেন যেখানে নিরাপত্তার প্রতিফলন ঘটবে মানুষের জীবনে, অস্ত্রভাণ্ডারে নয়; যেখানে দারিদ্র্যকে ক্যানসারের মতো জরুরি সমস্যা হিসেবে মোকাবিলা করা হবে এবং লিঙ্গসমতা উন্নয়নের মূলধারায় স্থান পাবে। 'যারা নৈরাশ্যবাদী, তাদের উন্নয়নের কাজে থাকা উচিত নয়'—বলে তিনি সাধারণ মানুষের সংগ্রামী শক্তি ও দূরদর্শিতার ওপর অগাধ আস্থা রেখেছিলেন। ১৯৯৮ সালের ১৬ জুলাই প্রয়াত হওয়া এই দার্শনিকের টেবিলে রাখা একটি ফলকে লেখা ছিল: 'আমার সঙ্গে একমত হতে তোমরা অনেক বিলম্ব করে ফেলেছ, কারণ আমি ইতোমধ্যেই আমার মত বদলে ফেলেছি।' সেলিম জাহানের মতে, তাঁর মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পরও বিশ্ব এখনো পুরোপুরি মাহবুব উল হকের ব্যক্তিত্বের মহত্ত্ব, চিন্তার ব্যাপ্তি ও স্বপ্নের বিশালতাকে মূল্যায়ন করার সময় পায়নি।



