বর্ষা মৌসুমে টানা বৃষ্টিপাত ছাদবাগানের গাছপালাকে যেমন সতেজ করে তোলে, তেমনি অতিবৃষ্টি ডেকে আনে নানা সমস্যা। সূর্যালোকের অভাব, পানি জমে থাকা এবং স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ার কারণে ছত্রাক ও পোকামাকড়ের আক্রমণ বেড়ে যায়। তাই এ সময় সঠিক পরিচর্যা না পেলে বছরের পর বছর লালন করা প্রিয় বাগানটি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সম্প্রতি ফলবীথি হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. রুহিদ হাসান বর্ষাকালীন ছাদবাগানের যত্ন নিয়ে কিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, যা অনুসরণ করলে আপনার ছাদের বাগান থাকবে সুস্থ ও সবুজ।
চারা রোপণের উপযুক্ত সময় হিসেবে বর্ষাকালকেই বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। তার ভাষ্য, 'বর্ষার নিয়মিত বৃষ্টির ফলে মাটিতে পর্যাপ্ত রস থাকায় এখনই চারা রোপণের উপযুক্ত সময়।' তবে বৃক্ষমেলা বা নার্সারি থেকে গাছ কিনে আনার পর সরাসরি রোদে বা ছাদে রাখা উচিত নয়। নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে গাছটিকে অন্তত ৪-৫ দিন আধা ছায়ায় (সেমি-শেড) রাখতে হবে। এরপর যে টবে রোপণ করা হবে, তার তলায় ইটের খোয়া বা বালু দিয়ে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করে তবেই চারা স্থাপন করতে হবে। ভারী বৃষ্টির দিনে নতুন গাছ রোপণ না করে আকাশ কিছুটা পরিষ্কার হলে তবেই কাজটি করা শ্রেয়।
পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায় কোনো ত্রুটি রাখা চলবে না। টব বা ড্রামে যেন পানি জমে না থাকে, সেদিকে কড়া নজর দিতে হবে। মাটিতে ভিজা ভাব থাকলে বাড়তি পানি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। অনেকে দৈনন্দিন অভ্যাসের বশে বৃষ্টির পরেও গাছে পানি দিয়ে ফেলেন, যা শিকড় পচিয়ে ফেলতে পারে—এমনকি গাছ মেরে ফেলারও কারণ হতে পারে। এ বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।
এ সময় গাছের মৃত, পচা বা রোগাক্রান্ত ডালপালা ছেঁটে ফেলা অত্যন্ত জরুরি। বর্ষাকালে ডাল ছাঁটাই করলে গাছ দ্রুত সেই ক্ষত পূরণ করতে পারে। তবে কাটা অংশে ছত্রাকের সংক্রমণ রোধে সামান্য হলুদ গুঁড়ো বা ছত্রাকনাশক লাগিয়ে দেওয়া উচিত।
স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় রোগবালাই ও পোকামাকড়ের উৎপাত স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। বিশেষ করে ছাদবাগানে মরিচ চাষ করা হলে মাকড়ের আক্রমণের ঝুঁকি থাকে। নিয়মিত বাগান পরিদর্শন করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞ। প্রয়োজন অনুযায়ী মাকড়নাশক ও ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে।
সার প্রয়োগের ক্ষেত্রে রুহিদ হাসানের সুপারিশ হলো, বর্ষার আগে একবার এবং বর্ষার পরে আরেকবার—এই দুই ধাপে সার দেওয়া। পুরো বছরের জন্য প্রয়োজনীয় সারের অর্ধেক বর্ষার শুরুতে এবং বাকি অর্ধেক বর্ষার শেষে দিলে গাছ ভালোভাবে বাড়তে পারে। জৈব বা সুষম সার ব্যবহার করা যেতে পারে।
ঝড়-বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা পেতে লম্বা গাছগুলোতে অবশ্যই শক্ত খুঁটি দিতে হবে। লতানো গাছের মাচা ভালোভাবে বেঁধে রাখতে হবে। ছোট টবগুলো ঝড়ের আগেই নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
শেষ পর্যন্ত, ছাদবাগানের পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধেও মালিকদের সচেতন থাকতে হবে। টবের নিচে রাখা ট্রে বা ভাঙা পাত্রে স্বচ্ছ পানি জমলে তা এডিস মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়। নিয়মিত ছাদ পরিষ্কার রাখলে মশার উৎপাত কমানো সম্ভব। একটুখানি বাড়তি যত্নই বাগানকে রাখবে প্রাণবন্ত আর রোগমুক্ত।


