আজ ২০ আগস্ট বিশ্ব মশা দিবস। ঠিক এই দিনে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত এশিয়া প্যাসিফিক মসকিউটো অ্যান্ড ভেক্টর কন্ট্রোল কনফারেন্সে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা উপস্থাপন করা হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে জাপানের Institute of Health Security-এর গবেষকদের সহযোগিতায় পরিচালিত এই অনুসন্ধান শুরু হয় ২০২৩ সালে এবং এখনো অব্যাহত রয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে ব্যাংককে উপস্থাপিত এই গবেষণায় ঢাকা ও চট্টগ্রামের এডিস মশার ওপর ছয়টি মশানাশকের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়।
পরীক্ষার ফল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনটি ভিন্ন শ্রেণির—পাইরেথ্রয়েড, কার্বামেট ও অর্গানোফসফেট—মোট ছয়টি রাসায়নিকের মধ্যে পাঁচটির বিরুদ্ধেই এডিস ইজিপ্টি প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। কেবল অর্গানোফসফেট শ্রেণির ম্যালাথিয়নই এখনো কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। ৫ শতাংশ ঘনত্বের ম্যালাথিয়ন প্রয়োগের ২৪ ঘণ্টা পর ঢাকা ও চট্টগ্রামের মাঠ থেকে সংগৃহীত ৯৮ শতাংশ মশা মারা যায়। গবেষণায় মশার শরীরে কীটনাশক প্রতিরোধের সঙ্গে জড়িত দুটি জিনগত পরিবর্তনও শনাক্ত করা হয়েছে।
গবেষণার জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থান থেকে এডিস মশার লার্ভা ও পূর্ণবয়স্ক মশার ১ হাজার ৪৫০টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। সরাসরি লার্ভা সংগ্রহের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ফাঁদও ব্যবহৃত হয়। পরে গবেষণাগারে প্রজাতি শনাক্ত এবং মশানাশকের সংবেদনশীলতা পরীক্ষা করা হয়। মাঠ থেকে সংগৃহীত প্রথম প্রজন্ম ও সেগুলো থেকে গবেষণাগারে জন্মানো পরবর্তী প্রজন্ম—উভয় ধরনের মশার ওপর আলাদাভাবে পরীক্ষা চালানো হয়। মশানাশক প্রয়োগের ১ ঘণ্টা এবং ২৪ ঘণ্টা পর মৃত্যুহার গণনা করা হয়।
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে পাইরেথ্রয়েড শ্রেণির পারমেথ্রিনের ক্ষেত্রে। শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ ঘনত্বে প্রয়োগের ২৪ ঘণ্টা পর ঢাকায় মাত্র ১০ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৭ শতাংশ মশা মারা যায়। অর্থাৎ ঢাকায় ৯০ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৯৩ শতাংশ মশা বেঁচে ছিল। এমনকি ঘনত্ব ১০ গুণ বাড়িয়ে ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ করার পরও ঢাকায় ৭৯ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৮৪ শতাংশ এডিস মশা জীবিত ছিল। ইটোফেনপ্রক্সের ০ দশমিক ৫০ শতাংশ ঘনত্বেও ঢাকায় ৯৩ শতাংশ ও চট্টগ্রামে ৯০ শতাংশ মশা ২৪ ঘণ্টা পর বেঁচে যায়। ডেল্টামেথ্রিনের ০ দশমিক ০৫ শতাংশ ঘনত্বে ঢাকায় ৮৩ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৮৪ শতাংশ মশা বেঁচে ছিল; যদিও ঘনত্ব বাড়ালে মৃত্যুহার কিছুটা বৃদ্ধি পায়। আলফা-সাইপারমেথ্রিনের একই ঘনত্বে ঢাকায় ৬৮ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৮৩ শতাংশ মশা বেঁচে যায়; ০ দশমিক ৫০ শতাংশ ঘনত্বেও ঢাকায় ৫৭ শতাংশ ও চট্টগ্রামে ৩৪ শতাংশ মশা জীবিত ছিল। কার্বামেট শ্রেণির বেন্ডিওকার্বের ০ দশমিক ১০ শতাংশ ঘনত্বে ঢাকায় ৪৪ শতাংশ ও চট্টগ্রামে ৩৫ শতাংশ মশা ২৪ ঘণ্টা পরও বেঁচে ছিল।
অন্যদিকে, মাঠের মশা থেকে গবেষণাগারে জন্মানো পরবর্তী প্রজন্মের ওপর পরীক্ষায় মৃত্যুহার ৯৯ শতাংশ পাওয়া গেছে। তবে গবেষকরা সতর্ক করছেন—মাত্র একটি রাসায়নিক এখনো কার্যকর হওয়ায় তার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা নিরাপদ নয়। একই কীটনাশক একটানা ও নির্বিচারে ব্যবহার করলে ভবিষ্যতে সেটির বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ তৈরি হতে পারে।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বিশিষ্ট কীটতত্ত্ববিদ তৌহিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, মশানাশকগুলোর এডিস-প্রতিরোধী হয়ে ওঠা মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। এখন নতুন কোনো ওষুধ প্রয়োগ করলে সেটিও অকার্যকর হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘ক্রস রেজিস্ট্যান্স’ বলা হয়। তাঁর মতে, এই পরিস্থিতি ডেঙ্গুর মারাত্মক সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেনও একই সুরে বলেন, এখন মশা নিধনে শুধু রাসায়নিক পদ্ধতিতে কাজ হবে না। এর পাশাপাশি জৈব প্রযুক্তির প্রয়োগ অপরিহার্য। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মশা, রোগী ও ওষুধে মশার প্রতিরোধী হয়ে ওঠার বিষয়ে নিয়মিত নজরদারি। তিনি আরও বলেন, এই নজরদারি বর্তমানে অনুপস্থিত। যদি এই চিত্র নিয়মিত হাতে পাওয়া যায়, তাহলে ডেঙ্গু প্রতিরোধ অনেকটাই সহজ হয়ে উঠবে।
গবেষণার উপসংহারে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে এডিস ইজিপ্টি মশার মধ্যে পাইরেথ্রয়েড ও বেন্ডিওকার্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ পাওয়া গেছে, কিন্তু ম্যালাথিয়ন এখনো কার্যকর। তবে একক নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তাই শুধু স্প্রে নয়, সমন্বিত নজরদারি ও নতুন প্রযুক্তির সংমিশ্রণ এখন সময়ের দাবি।




