দেশে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে এক যৌথ গবেষণায়। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, হামে আক্রান্ত প্রতি তিনজন শিশুর মধ্যে দুজনই মাঝারি থেকে তীব্র অপুষ্টির শিকার। গত বুধবার শিশু হাসপাতাল মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়, যেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাইয়ের মধ্যে শিশু হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ১৪ বছরের কম বয়সী ৩৫৪ জন শিশুর ওপর এই সমীক্ষা চালানো হয়। হামের উপসর্গ নিয়ে আসা এসব শিশুর ৯৫ শতাংশের শরীরে হামের জীবাণু শনাক্ত হয়েছে। দুই প্রতিষ্ঠানের ১২ জন বিজ্ঞানী, গবেষক ও কর্মকর্তা এই গবেষণায় অংশ নেন। নমুনা পরীক্ষা ও জিন বিশ্লেষণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে আইসিডিডিআরবির ল্যাবরেটরিতে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম গবেষণার প্রথম অংশ উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, হামে আক্রান্ত ৭১ শতাংশ শিশু সরাসরি শিশু হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছে, বাকি ২৯ শতাংশ অন্য হাসপাতাল থেকে রেফার হয়ে এসেছে। গবেষণায় পাঁচ বছরের কম বয়সী ৩০৮ জন শিশুর পুষ্টি পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১২ শতাংশ শিশু তীব্র অপুষ্টিতে এবং ৫৩ শতাংশ শিশু মাঝারি মাত্রার অপুষ্টিতে ভুগছে। অর্থাৎ মোট ৬৫ শতাংশ শিশু অপুষ্টির শিকার, যা হামের তীব্রতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মাত্র ৩৪ শতাংশ শিশুর পুষ্টি পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল, বাকি ১ শতাংশের ওজন বয়সের তুলনায় বেশি ছিল।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৩৮ শতাংশ নিয়মিত মায়ের বুকের দুধ পায়নি। হামে মৃত্যুবরণ করা ১১টি শিশুর মধ্যে ৯টি শিশু (৮২ শতাংশ) শুধু মায়ের দুধ খেত না। মায়ের দুধের সঙ্গে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে, বিশেষ করে জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের দুধই শিশুর জন্য টিকার মতো কাজ করে।
টিকার ক্ষেত্রেও দেখা গেছে ভয়াবহ ঘাটতি। ৩৪২ জন শিশুর তথ্য পর্যালোচনা করে গবেষকেরা দেখেছেন, হামে আক্রান্ত ৪৩ শতাংশ শিশুর টিকা নেওয়ার বয়সই হয়নি, অর্থাৎ তাদের বয়স ৯ মাসের কম। টিকা নেওয়ার বয়স হওয়ার পরও ৩৭ শতাংশ শিশুকে কোনো টিকাই দেওয়া হয়নি। মাত্র ১৪ শতাংশ শিশু হামের টিকার এক ডোজ এবং ৬ শতাংশ শিশু দুই ডোজ পেয়েছে। দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও বেশ কিছু শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে, যা বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের দাবি রাখে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
আইসিডিডিআরবির জ্যেষ্ঠ পরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান হামের ভাইরাসের জিন বিশ্লেষণের তথ্য উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, বিশ্বজুড়ে হামের ভাইরাসের ২৮টি ধরন থাকলেও বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলে বি৩ ধরনটিই বেশি распространено। এই ধরনে খুব সামান্য রূপান্তর ঘটেছে, যা ভাইরাসটিকে আরও সংক্রামক করে তোলেনি। এর অর্থ, ভাইরাসের কারণে নয় বরং অন্যান্য কারণেই দেশে হাম ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে।
মোস্তাফিজুর রহমান আইসিডিডিআরবির আরেকটি গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, মা থেকে শিশুর শরীরে আসা হামের অ্যান্টিবডি দ্রুত কমে যায়। গর্ভাবস্থায় ৮৫ শতাংশ মায়ের রক্তে হামের অ্যান্টিবডি থাকলেও জন্মের পর প্রথম এক মাসে ৬০ শতাংশ শিশুর শরীরে এই অ্যান্টিবডি থাকে। ছয় মাস বয়সে হামের অ্যান্টিবডি সম্পূর্ণরূপে কমে যায়, আর ৯ মাসে তো তা থাকে না বললেই চলে। তিনি বলেন, ছয় মাস বয়সে হামের টিকা দিলে তা ভালো কাজ করে না, ৯ মাস বয়সে দিলে ভালো ফল পাওয়া যায় এবং বয়স আরও বেশি হলে ফল আরও ভালো হয়।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেন, দেশের মানুষ এখন হামের মহামারির মধ্যে পড়ে গেছে এবং এই প্রাদুর্ভাব থামানো কঠিন। হাম থামাতে টিকার বিকল্প নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, টিকা দেওয়ার জন্য ৪০ হাজার মাঠকর্মীর পদ থাকলেও বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন ২৫ হাজার, অর্থাৎ প্রায় ৪০ শতাংশ পদ খালি। এই অবস্থায় সব শিশুকে টিকা দেওয়া সম্ভব নয়। বহুমাত্রিক ব্যর্থতার কারণে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ‘ম্যাজিক বুলেট’ দিয়ে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয় উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সবকিছু ঠিকঠাক চললে হাম নিয়ন্ত্রণে আসতে কমপক্ষে দুই থেকে তিন মাস সময় লাগবে।
এদিকে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সরকারি ল্যাবরেটরিতে ৮৭ জনের নমুনায় হাম শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে দেশে মোট নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৭৬ জনে। গতকাল সারা দেশে তিন হাজারের বেশি হাম রোগী হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, হামের উপসর্গ নিয়ে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে, ফলে উপসর্গ নিয়ে মোট মৃত্যু দাঁড়িয়েছে ৮২৩ জনে। এ বছর হাম শনাক্ত হওয়া ৯৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, সব মিলিয়ে হামে মোট ৯২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ৯৩১ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছেন, আর এ বছর মোট ১ লাখ ৪৫ হাজার ৭১১ জন হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।




