কলকাতার নিউমার্কেট সংলগ্ন মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে গত মঙ্গলবার রাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ওই ঘটনায় শিশুসহ মোট নয়জনের প্রাণহানি হয়। নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশের সাতজনের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তাঁর স্ত্রী আফসানা শারমীন, তিন বছরের পুত্র শর্ণশীষ দত্ত এবং শ্বশুর আকরাম হোসেন। এ ছাড়া সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার রেবতী সরকার ও আলিমুজ্জামান সাজু এবং ঢাকার সাভারের আমিনবাজারের ব্যবসায়ী আহম্মেদ বাবুর নামও নিহতের তালিকায় রয়েছে।

দেবাশীষ দত্ত অসুস্থ স্ত্রী আফসানা শারমীনের চিকিৎসার উদ্দেশ্যে গত ৪ আগস্ট ভারতে যান। প্রথমে বেঙ্গালুরুতে চিকিৎসা নেওয়ার পর প্রায় ১৩ দিনের চিকিৎসা শেষে সোমবার রাতে তাঁরা কলকাতায় ফিরে আসেন। মঙ্গলবার আত্মীয়দের জন্য কেনাকাটা সম্পন্ন করার পর বুধবার দেশে ফেরার কথা ছিল তাঁদের। কিন্তু মঙ্গলবার রাতের ওই আগুনে পুরো পরিবারটি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। দেবাশীষের একমাত্র কন্যা মহিমা দত্ত (৭) বর্তমানে কুষ্টিয়ার আড়ুয়াপাড়ার বাড়িতে স্বজনদের সঙ্গে অবস্থান করছেন।

শিশুটি এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি যে তাঁর বাবা, মা ও ছোট ভাই আর বেঁচে নেই। কখনো মন খারাপ করে একা বসে থাকছে, আবার কখনো অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলা করছে। বাড়িতে সান্ত্বনা জানাতে আসা মানুষের ভিড়ের মধ্যে মাঝেমধ্যে বাবার মৃত্যুর কথা বললেও সে এখনো তাঁদের ফেরার অপেক্ষায় রয়েছে। গত মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে বাবার সঙ্গে শেষবারের মতো কথা হয়েছিল তার। তখন দেবাশীষ জানিয়েছিলেন, মহিমার জন্য লেহেঙ্গা ও চকলেট কিনেছেন, যা পরদিন সকালে দেশে ফিরে তাকে দেবেন। কুষ্টিয়া শহরের একটি স্কুলে কেজি শ্রেণিতে পড়াশোনা করা মহিমার স্কুলের শিক্ষকেরা বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে তাঁর বাড়িতে গিয়ে সমবেদনা জানান। স্কুল কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দিয়েছে, মহিমার উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনার সব খরচ তারা বহন করবে।

কুষ্টিয়ার আড়ুয়াপাড়ায় দেবাশীষের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তাঁর মা স্বপ্না দত্তের বিলাপ থামছে না। স্বজনেরা তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। দেবাশীষের সহকর্মী সাংবাদিকেরা তাঁর সামনে এলে বারবার বলছেন, ‘আমার দেবা কই গো। তোমাদের সাথে নাই? কখন আসবে আমার দেবা। ওর জন্য পাবদা মাছ রান্না করে রাখিছি।’ এদিকে গতকাল রাতে পৃথকভাবে তাঁদের বাড়িতে যান কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য আমির হামজা ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কুতুব উদ্দীন। মহিমার পড়ালেখার বিষয়ে কী উদ্যোগ নেওয়া যায়, সে ব্যাপারে আশ্বাস দেন সংসদ সদস্য। বিএনপি নেতা কুতুব উদ্দীনও শিশুটির ভবিষ্যৎ জীবনে খোঁজখবর রাখবেন বলে জানান।

অন্যদিকে কলকাতায় অবস্থান করছেন দেবাশীষের ভগ্নিপতির ভাই কাঞ্চন নন্দী। যোগাযোগ অ্যাপে প্রথম আলোকে তিনি জানান, এখনো লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়নি। কিছু কাগজপত্র পুনরায় জমা দিতে হচ্ছে। সেগুলো নিয়ে থানায় অবস্থান করছেন তিনি। দুপুরের পর ময়নাতদন্ত হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। কলকাতার বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব (রাজনৈতিক) মো. ওমর ফারুক আকন্দ মুঠোফোনে জানান, দেবাশীষের স্বজনেরা সেখানে পৌঁছেছেন। পুলিশ এখনো লাশ হস্তান্তর করেনি। হস্তান্তরের পর উপহাইকমিশনের প্রায় দুই ঘণ্টার কিছু প্রক্রিয়া রয়েছে। সেগুলো শেষ হলেই লাশ পাঠানো হবে। সম্ভবত বিকেল চারটা থেকে পাঁচটার মধ্যে তা সম্ভব হতে পারে। তবে সবকিছু নির্ভর করছে পুলিশের লাশ হস্তান্তরের ওপর।

অপরদিকে, বাবার মৃত্যুর সংবাদ শুনে আট বছরের রোজা ‘বাবা, বাবা’ বলে কাঁদছিল বলে জানা গেছে। এই মর্মান্তিক ঘটনায় দেশের বিভিন্ন মহলে শোকের ছায়া পড়েছে। নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।