দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ মাস পর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদে নিয়োগ সম্পন্ন করেছে বিএনপি সরকার। গত সোমবার রাতে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামানকে দুদকের চেয়ারম্যান হিসেবে এবং জাহাঙ্গীর আলম খান ও মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়াকে কমিশনার পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে চেয়ারম্যান পদে একজন সাবেক বিচারপতিকে বসানো নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও আইনজ্ঞদের মতে, এই নিয়োগটি সংবিধানের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ রিদওয়ানুল হক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ইংরেজিতে লেখা পোস্টে এই পদক্ষেপকে 'বিচার বিভাগের স্বাধীনতার লঙ্ঘন' বলে অভিহিত করেছেন। তিনি দাবি করেন, সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতিকে দুদকের প্রধান করা একটি অসাংবিধানিক পদক্ষেপ। তাঁর মতে, বর্তমান সরকার গণতন্ত্রের বিপরীত পথে পরিচালিত হচ্ছে। রিদওয়ানুল হক প্রথম আলোকে তাঁর এই মন্তব্যের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

সংবিধানের ৯৯(১) ও ৯৯(২) অনুচ্ছেদে অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের পরবর্তী কর্মসংস্থানের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সুপ্রিম কোর্টের বিচারকেরা অবসরে যাওয়ার পর আইন পেশায় নিয়োজিত হতে পারবেন না এবং বিচার বিভাগীয় বা আধা বিচার বিভাগীয় পদ ছাড়া প্রজাতন্ত্রের অন্য কোনো লাভজনক পদে নিয়োগের যোগ্য হবেন না। আইনজ্ঞদের যুক্তি হলো, দুদক কোনো বিচার বিভাগীয় বা আধা বিচার বিভাগীয় প্রতিষ্ঠান নয় এবং এর চেয়ারম্যানের পদটিও তেমন কোনো পদ নয়। যেহেতু এটি একটি লাভজনক পদ, তাই আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে এখানে নিয়োগ দেওয়া সংবিধানের ৯৯ অনুচ্ছেদের চেতনার পরিপন্থী।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া এই নিয়োগের সমালোচনা করে বলেন, এই ধরণের নিয়োগের ফলে সংবিধানের চেতনার সাথে সংঘাত তৈরি হয়। তিনি উল্লেখ করেন, ২০০৬ সালে হাইকোর্ট বিভাগের সাবেক বিচারপতি সুলতান হোসেন খানকে দুদকের প্রথম চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ার সময়ও একই বিতর্ক উঠেছিল এবং আদালতে রিট করা হয়েছিল, যা পরে খারিজ হয়। তবে বর্তমান সংস্কারের প্রেক্ষাপটে ওই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার কথা জানান তিনি।

অন্যদিকে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতির দুদকের শীর্ষ পদে আসা 'স্বার্থের সংঘাত' বা কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট তৈরি করতে পারে। তিনি জানান, দুদক মূলত একটি তদন্তকারী সংস্থা, বিচারিক সংস্থা নয়। একজন সাবেক বিচারপতির কাছ থেকে যে সততা ও মূল্যবোধের প্রত্যাশা করা হয়, দুদকের চেয়ারম্যান পদ গ্রহণ করা তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

উল্লেখ্য, ২০০৩ সালে অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে হাইকোর্টে যোগ দিয়ে ২০০৫ সালে স্থায়ী হন বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান। পরবর্তীতে গত বছরের ২৫ মার্চ তিনি আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন এবং চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি অবসর গ্রহণ করেন।

দুদক আইনে বলা হয়েছে যে, আইন, শিক্ষা, প্রশাসন, বিচার বা শৃঙ্খলা বাহিনীতে ২০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি কমিশনার হতে পারেন। যদিও আইনে বিচারকদের কথা বলা আছে, তবে আইনজ্ঞদের মতে, দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানের বিধিনিষেধের সামনে এই আইন কার্যকর হবে না। নিয়োগ প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে গত ২২ জুন বিচারপতি মো. রেজাউল হকের সভাপতিত্বে পাঁচ সদস্যের একটি সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। জানা গেছে, প্রায় ৪০টি আবেদন জমা পড়েছিল, তবে চূড়ান্তভাবে এই তিনজনের নাম কীভাবে নির্বাচন করা হলো, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।