প্রস্তাবিত নতুন গুম প্রতিরোধ আইনের খসড়ায় তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের ওপর ন্যস্ত করার কথা বলা হয়েছে, যা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের (এনএইচআরসি) আগের ভূমিকা থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়। গুমের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখলেও কয়েকটি অপরাধের সর্বনিম্ন সাজা কমানো হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে খসড়াটি অংশীজনদের মতামতের জন্য প্রকাশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বুধবার (২৯ জুলাই) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে খসড়া নিয়ে আন্তমন্ত্রণালয় সভা হবে, পরে তা মন্ত্রিসভায় তোলা হবে। পরবর্তী সংসদ অধিবেশনে আইনটি পাস হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গত বছর ২৮ আগস্ট ‘গুম প্রতিরোধ, প্রতিকার ও সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন পায়। একই বছরের ৬ নভেম্বর অধ্যাদেশটি জারি করা হয়, যেখানে গুমের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনার জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে। ওই কমিটির সুপারিশে ৪টি অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়, যার মধ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশও ছিল। বাকি ১৬টি অধ্যাদেশের মধ্যে গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশটি নতুন আইন করে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নতুন খসড়ায় অধ্যাদেশের নাম থেকে ‘সুরক্ষা’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছে; এখন নাম রাখা হয়েছে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন’।

তদন্তের দায়িত্ব পরিবর্তনের যুক্তি দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ফৌজদারি কার্যবিধি (সিআরপিসি) অনুযায়ী তদন্ত শুধু পুলিশই করতে পারে, তাই এনএইচআরসিকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) এ নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছে। সংস্থাটির এশিয়া উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেছেন, পুলিশকে দিয়ে গুমের ঘটনা তদন্ত করালে কোনো জবাবদিহি নিশ্চিত হবে না এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও গড়ে উঠবে না।

খসড়া আইনে গুমের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী বা শৃঙ্খলা বাহিনীর (সেনা, নৌ, বিমান, পুলিশ, আনসার, বিজিবি, কোস্টগার্ড, গোয়েন্দা সংস্থা, র্যাব বা যৌথ বাহিনী) সদস্য নিজ পরিচয়ে বা সরকারের সমর্থনে কাউকে গ্রেপ্তার, আটক বা অপহরণ করে তার অবস্থান গোপন রাখলে বা স্বাধীনতা হরণের বিষয়টি অস্বীকার করলে তা গুম হিসেবে গণ্য হবে। গুমের ফলে ভুক্তভোগীর মৃত্যু ঘটলে বা পাঁচ বছর পরও তার সন্ধান না মিললে অপরাধীর শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, পাশাপাশি সর্বনিম্ন পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও এক কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা। গুমের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন বা সর্বনিম্ন তিন বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

গুমের আলামত ও সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট করার অপরাধে অধ্যাদেশে সর্বনিম্ন সাত বছরের কারাদণ্ড ছিল, যা খসড়ায় পাঁচ বছরে নামিয়ে আনা হয়েছে। জরিমানা আগের মতো ২০ লাখ টাকা রাখা হয়েছে। গোপন আটককেন্দ্র বা আয়নাঘর নির্মাণের জন্যও সর্বনিম্ন সাজা সাত থেকে কমিয়ে পাঁচ বছর করা হয়েছে, জরিমানা ২০ লাখ টাকা। অপরাধের সঙ্গে জড়িত অধস্তনদের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যদি জানার পরও প্রতিরোধে ব্যর্থ হন বা অবহেলা করেন, তবে তাদেরও মূল অপরাধীর সমান শাস্তি (মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন) দেওয়া হবে। আইনে বলা হয়েছে, আদালত ধরে নিতে পারেন যে অধস্তনদের ওপর ঊর্ধ্বতনদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল। শৃঙ্খলা বাহিনীর বাইরের ঊর্ধ্বতনদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে।

অভিযোগ দাখিলের প্রক্রিয়ায় বলা হয়েছে, ভুক্তভোগী বা প্রত্যক্ষদর্শী বা ঘটনা সম্পর্কে জানা ব্যক্তি থানার ওসির কাছে লিখিত অভিযোগ করবেন। ওসি গ্রহণে অস্বীকার করলে অভিযোগকারী এখতিয়ারসম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নালিশি মামলা করতে পারবেন। তদন্ত কর্মকর্তাকে ৯০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে, আদালত সর্বোচ্চ ৩০ দিন বাড়াতে পারবেন। ব্যর্থ হলে তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকার গুম সংক্রান্ত একটি তথ্যভান্ডার তৈরি করবে, যেখানে ভুক্তভোগীদের তথ্য থাকবে। ভুক্তভোগীর পরিবারের ভরণপোষণ ও দায় পরিশোধের জন্য আদালত ‘গুম সনদ’ প্রত্যয়নপত্র ইস্যু করবেন, যা দিয়ে সম্পত্তি পরিচালনা ও হস্তান্তর সম্ভব হবে। পাঁচ বছর পর ভুক্তভোগী ফিরে না এলে সম্পত্তি বৈধ উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টনযোগ্য বলে আদালত ঘোষণা দিতে পারবেন। ভুক্তভোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা, পুনর্বাসন, আইনি সহায়তা ও ক্ষতিপূরণের জন্য সরকার একটি বিশেষ তহবিল গঠন করবে, যাতে দণ্ডিতদের কাছ থেকে আদায় করা জরিমানার অর্থ যাবে। যদি কোনো গুমের অভিযোগ মিথ্যা ও হয়রানিমূলক প্রমাণিত হয়, তবে আদালত আবেদনকারীকে কারণ দর্শানোর সুযোগ দিয়ে আসামিকে ক্ষতিপূরণ এবং মিথ্যা মামলাকারীকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিতে পারবেন।