হঠাৎ করে কোনো খাবার বা পদার্থের সংস্পর্শে এসে শরীরে চরম প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে তা প্রাণঘাতী হতে পারে। ১৯০২ সালে বিজ্ঞানী পল পোর্টিয়ার ও চার্লস রিচেট সামুদ্রিক অ্যানিমোনের বিষ নিয়ে গবেষণা করার সময় এই ঘটনার মুখোমুখি হন। তাঁরা প্রথমে কুকুরদের শরীরে বিষটি প্রবেশ করান, তখন কুকুরগুলো সুস্থ ছিল। কিন্তু কিছুদিন পর একই কুকুরদের একই পরিমাণ বিষ দিলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেগুলো মারাত্মক অসুস্থ হয়ে মারা যায়। প্রতিরোধের বিপরীত এই প্রতিক্রিয়ার নাম তাঁরা রাখেন অ্যানাফাইল্যাক্সিস। এই আবিষ্কারের জন্য চার্লস রিচেট ১৯১৩ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

একটি উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা বোঝা যায় — কোনো ব্যক্তি প্রথমবার সামুদ্রিক খাবার খেয়ে উপকৃত হন, কিন্তু দ্বিতীয়বার একই খাবার খেলে তাঁর ঠোঁট ফুলে যাওয়া, সারা শরীরে চাকা, শ্বাসকষ্ট এবং জ্ঞান হারানোর মতো গুরুতর লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এই অবস্থাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে অ্যানাফাইল্যাক্সিস বলা হয়, যা টাইপ ১ হাইপার সেনসিটিভিটির অন্তর্গত। অ্যালার্জির বর্ণালি ধুলাবালুর মৃদু হাঁচি থেকে শুরু করে এই মারাত্মক প্রাণঘাতী অবস্থা পর্যন্ত বিস্তৃত।

প্রক্রিয়াটি দুটি ধাপে ঘটে। প্রথম ধাপ হলো সেনসিটাইজেশন, যেখানে শরীর প্রথমবার কোনো অ্যালার্জেনের সংস্পর্শে এলে টি হেলপার ২ কোষ সক্রিয় হয়। এই কোষ ইন্টারলিউকিন-৪ ও ইন্টারলিউকিন-১৩ নামক দুই ধরনের সংকেত অণু ক্ষরণ করে, যা বি লিম্ফোসাইটকে ইমিউনোগ্লোবিউলিন ই (IgE) তৈরি করতে উদ্বুদ্ধ করে। এই IgE রক্তের মাধ্যমে মাস্ট কোষ ও বেসোফিলের পৃষ্ঠে অবস্থিত FcεRI রিসেপ্টরের সাথে যুক্ত হয়। মাস্ট কোষ কোষকলায় বাস করে এবং বেসোফিল রক্তে বিচরণ করে।

দ্বিতীয় ধাপে, একই অ্যালার্জেন আবার শরীরে প্রবেশ করলে তা মাস্ট কোষের পৃষ্ঠে অবস্থিত একাধিক IgE-এর সাথে যুক্ত হয়ে ক্রসলিংকিং তৈরি করে। এর ফলে কোষের ভেতরের দানাগুলো হিস্টামিন, ট্রিপটেজসহ বিভিন্ন রাসায়নিক মেডিয়েটর বের করে দেয়। হিস্টামিন রক্তনালি প্রসারিত করে এবং রক্তনালির এন্ডোথেলিয়ামের ফাঁক বাড়িয়ে দেয়, ফলে রক্তরস বেরিয়ে গিয়ে ফোলাভাব ও চাকা তৈরি হয়। একই সঙ্গে শ্বাসনালির মসৃণ পেশি সংকুচিত হয়ে শ্বাসকষ্ট, গলায় ঘড়ঘড় শব্দ এবং বুকে শোঁ শোঁ আওয়াজ দেখা দেয়।

সারা শরীরে দ্রুত এই প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়লে রক্তচাপ কমে গিয়ে শক অবস্থা সৃষ্টি হয়। রক্তের কার্যকর পরিমাণ কমে যাওয়া এবং রক্তনালির প্রসারণ একত্রে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে রক্তপ্রবাহ কমিয়ে দেয়। কয়েক মিনিটের এই অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে তা প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

তবে এই প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে শরীরেরই একটি জাদুর কাঠি আছে — অ্যাড্রেনালিন। হিস্টামিনের টার্গেট অঙ্গগুলোতে অ্যাড্রেনারজিক রিসেপ্টরও থাকে, যার কাজ হিস্টামিনের বিপরীত। অ্যানাফাইল্যাক্সিসের প্রথম সারির চিকিৎসা হলো মাংসপেশিতে অ্যাড্রেনালিন ইনজেকশন দেওয়া। এটি রক্তনালি সংকুচিত করে রক্তরস বের হওয়া কমায়, শ্বাসনালি প্রসারিত করে শ্বাসকষ্ট দূর করে এবং হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন বাড়িয়ে শক অবস্থা থেকে রোগীকে ফিরিয়ে আনে। অ্যান্টিহিস্টামিন বা স্টেরয়েড এত দ্রুত ও বহুমুখীভাবে কাজ করতে পারে না। এ কারণে ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের সবসময় একটি অ্যাড্রেনালিন অটো-ইনজেক্টর বহন করার পরামর্শ দেওয়া হয়।