স্বাস্থ্য খাতে এবারের বাজেটে বরাদ্দের পরিমাণ বেড়েছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জিডিপির ১ শতাংশের বেশি অর্থ বরাদ্দ পেয়েছে এই খাত। সেইসঙ্গে ক্যানসারসহ ছয়টি দুরারোগ্য রোগের বিদ্যমান চিকিৎসা ভাতা দ্বিগুণ করে এক লাখ টাকায় উন্নীত করার ঘোষণা এসেছে। এই সুবিধা পৌঁছবে ৬৫ হাজার রোগীর কাছে। এছাড়া ক্যানসারের ওষুধ, ডায়ালাইসিস সামগ্রী, হৃদরোগের স্টেন্ট ও চোখের লেন্সের মতো চিকিৎসা সরঞ্জামের ওপর কর ও শুল্ক হ্রাস করা হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের ওপর চিকিৎসার আর্থিক বোঝা কিছুটা কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাজেটের বিভিন্ন উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন স্বাস্থ্য খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ক্যানসার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. পারভীন শাহিদা আখতার বলেন, ক্যানসারের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। ভাতা বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জন্য সহায়ক হলেও সরকারি হাসপাতালে সেবা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, আর বেসরকারি হাসপাতালের খরচ বহু রোগীর সামর্থ্যের বাইরে। তিনি ভবিষ্যতে ক্যানসার প্রতিরোধ ও স্ক্রিনিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন। তার মতে, প্রাথমিক অবস্থায় রোগ শনাক্ত হলে খরচ ও ভোগান্তি দুটোই কমে এবং অনেক ক্ষেত্রে রোগ সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বীকন ফার্মাসিউটিক্যালসের অনকোলজি বিভাগের পরিচালক এস এম মাহমুদুল হক পল্লব বলেন, দুরারোগ্য রোগের ভাতা দ্বিগুণ করায় সামাজিক সচেতনতা বাড়বে এবং অর্থাভাবে যারা চিকিৎসা শুরু করতে ভয় পান, তারা এগিয়ে আসবেন। তিনি জানান, এবারের বাজেটে অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রিডিয়েন্ট (এপিআই) তৈরির নতুন ৫১টি কাঁচামালের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে, যার মধ্যে নয়টিই ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। এর ফলে ওষুধের দাম কমার সম্ভাবনা রয়েছে, যা দেশীয় রোগী এবং রপ্তানি বাজার—দুই ক্ষেত্রেই উপকার বয়ে আনবে।

স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ও বিএসএমএমইউর অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন বলেন, বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার প্রতি গুরুত্ব, ওষুধের কাঁচামালে কর减免 ও স্বাস্থ্যপ্রযুক্তিতে উৎসাহ—এসব ইতিবাচক দিক। তবে কাঙ্ক্ষিত কাঠামোগত সংস্কারের জন্য আরও সাহসী পদক্ষেপ প্রয়োজন। তিনি শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও গেটকিপিং ব্যবস্থা, প্রশাসনিক ও আর্থিক বিকেন্দ্রীকরণ, স্বাস্থ্য কমিশন গঠন, ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যবিমা চালু করার মতো চ্যালেঞ্জিং বিষয়গুলো সমাধানের ওপর জোর দেন। তার মতে, বাজেট একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা, কিন্তু সুশাসন, দক্ষ বাস্তবায়ন ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার সুনিশ্চিত করলেই তা কার্যকর ও জনমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি হয়ে দাঁড়াবে।

সব মিলিয়ে এবারের বাজেটকে স্বাস্থ্য খাতে সংস্কারের পথে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে তারা একমত যে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি সুষ্ঠু বাস্তবায়ন, বাজার তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে না পারলে সাধারণ মানুষের কাছে এর সুফল পৌঁছানো কঠিন হবে।