চীনের সাংহাইয়ের পুডং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছেই অবস্থিত একটি ক্ষুদ্র গ্রাম। বিমানবন্দরের কৃত্রিম পরিবেশ ও নগরায়ণের দাপট থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছে গ্রামটি। সম্প্রতি এক বাংলাদেশি ভ্রমণকারী সেখানে যান। পরিবারকে রিসিভ করতে বিমানবন্দরে এসেছিলেন তিনি। ফ্লাইট বিলম্বের কারণে এক ঘণ্টার কিছু বেশি সময় পেয়ে যান। সেই ফাঁকে বিমানবন্দরের মূল সড়ক ছেড়ে অদূরের একটি সরু গলি ধরে হাঁটতে থাকেন। শেষে গিয়ে পৌঁছান এই গ্রামে।
গ্রামে পা দিয়েই নজর কাড়ে সবজি চাষের সমারোহ। প্রতিটি বাড়ির সামনের জমির ইঞ্চি ইঞ্চি অংশে শাকসবজি। লম্বা লম্বা শসা মাচায় ঝুলছে, মোটা বেগুন পাতার আড়ালে লুকিয়ে। টমেটো, মরিচ, লাউ, করলা, ডাটা— সব মিলিয়ে চেনা সবজির এক মেলা। কিন্তু সবচেয়ে বিস্মিত করেন এখানকার বাসিন্দারা। প্রায় সবাই প্রবীণ। তাঁদের মুখে বলিরেখা, চোখে অদ্ভুত শান্তি। বার্ধক্যের অবসাদ নেই, মৃত্যুর জন্য অপেক্ষার বিষণ্ণতা নেই। বরং প্রতিটি কাজে আছে উদ্দেশ্য ও প্রাণশক্তি।
তাঁরা সময় কাটান ফাঁকা গল্পে নয়। বরং মাটির ওপর নুয়ে পড়েন, নিজের হাতে গাছের যত্ন নেন সন্তানের মতো। বছরের পর বছর এই নীরব পরিশ্রম তাদের দেহ ও মনকে রেখেছে সবল ও কর্মক্ষম। সকালে ঘুম থেকে ওঠার অর্থ আছে, দিনভর কাজের ধারাবাহিকতা মানসিক অবসাদকে দূরে রাখে। খোলা বাতাস ও শারীরিক শ্রম তাদের সুস্থ রাখে। বৃদ্ধ বয়সকে তারা বোঝা হিসেবে নয়, বরং আশীর্বাদ হিসেবে গ্রহণ করেছে।
এই দৃশ্য দেখে ভ্রমণকারীর মনে প্রশ্ন জাগে: বাংলাদেশে কেন এ ধরনের চর্চা নেই? বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ, পৃথিবীর অন্যতম উর্বর মাটি, পর্যাপ্ত রোদ-বৃষ্টি আর অফুরন্ত শ্রমশক্তি থাকার পরও কেন শহরমুখী মানুষ আর প্রবীণদের ঘরের কোণে ঠেলে রাখা হয়? তারা বার্ধক্যকে রোগ বা বোঝা হিসেবে দেখেন। অথচ এই চীনা গ্রামের প্রবীণদের কৃষিচর্চা নতুন পথ দেখায়।
ছোট পরিসরে ঘরোয়া কৃষি বাংলাদেশের প্রবীণদের জীবন বদলে দিতে পারে। সরকারি প্রকল্প বা বড় পরিকল্পনা ছাড়াই প্রতিটি পরিবার নিজেদের পড়ে থাকা জমি, পুকুরপাড় বা ছাদের টবে সবজি চাষ শুরু করতে পারে। এতে যেমন খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, তেমনি পরিবারের বাড়তি আয়ের ব্যবস্থা হবে। বাজার থেকে সবজি কিনতে যে অর্থ সাশ্রয় হয়, তা মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য স্বস্তি। তার চেয়ে বড় কথা, এতে প্রবীণদের জীবন পায় নতুন ছন্দ। পরিবারের খাবারে অল্প অবদান রাখার গর্ব তাদের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নত করে। টেলিভিশন ও অপ্রয়োজনীয় গল্পের জগৎ থেকে বেরিয়ে তারা ফিরে আসতে পারেন মাটির কাছে।
ভ্রমণকারী শেষ পর্যন্ত গ্রাম ছেড়ে বিমানবন্দরে ফেরেন পরিবারকে নেওয়ার জন্য। শেষবারের মতো গ্রামের দিকে তাকান। গ্রামের নীরবতা তাকে জানান দেয়— তারা বিমানবন্দর, ইস্পাতের পাখি, নগরায়ণকে তাদের জীবনযাত্রার হুমকি হিসেবে দেখেননি। বরং মায়ের মতো জমিকে স্নেহ করে চলেছেন, শতাব্দী ধরে যেমন করে আসছেন। গাড়িতে বসে তিনি নিজের প্রতিবিম্ব দেখেন— এক বাংলাদেশি, যে পরিবারের কাছে ফিরছে কিন্তু সঙ্গে নিয়ে ফিরছে এক নতুন চিন্তা। তিনি ঠিক করেন, মাকে চিঠি লিখে বলবেন, বাড়ির পেছনে কয়েকটা বীজ পুঁতে দিতে। এই ছোট পরিবর্তন থেকেই হয়তো বড় কিছু ফুটবে।
পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন, বিশ্বজুড়ে শহরাঞ্চলে স্থানীয় ও জৈব খাদ্যের চাহিদা বাড়ছে। সাংহাইয়ের এই গ্রামের দৃষ্টান্ত দেখায় যে বয়স্ক জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে শহরের কাছাকাছি সবজি উৎপাদন করা সম্ভব। বাংলাদেশেও যদি এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়, তবে প্রবীণদের জীবনে যেমন অর্থ আসবে, তেমনি শহরের খাদ্য চাহিদাও পূরণ হবে। এটি একটি সহজ, সাশ্রয়ী ও টেকসই সমাধান হতে পারে।




