টানা কয়েক দিনের অতি ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার পাঁচটি জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) সকাল থেকেও বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় নদ-নদী ও খালের পানির উচ্চতা বাড়ছে। কিছু এলাকা থেকে পানি নেমে গেলেও নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। চার দিন ধরে চলা এই বৃষ্টিতে চট্টগ্রামের আটটি উপজেলা—সীতাকুণ্ড, বাঁশখালী, লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, রাউজান, হাটহাজারী, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ি—ডুবে গেছে। রাঙামাটির বাঘাইছড়ি, খাগড়াছড়ি সদর, লংগদু, বান্দরবান সদর ও লামা এবং কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাও পানির নিচে।
বৃষ্টি ও ঢলের কারণে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনের বিভিন্ন অংশ তলিয়ে যাওয়ায় ওই রুটে সব ধরনের ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়ায় শতাধিক পরিবারের ঘরে পানি ঢুকেছে। জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় একটি সড়ক ভেঙে খাদে পড়েছে। ভাটিয়ারী আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১৫২টি পরিবারের মধ্যে ১২০টির ঘরে পানি উঠেছে। কুমিরা, সোনাইছড়ি, বারৈয়ারঢালা ও মুরাদপুর এলাকার সড়ক ও বসতবাড়ি তলিয়ে গেছে। পানিবন্দী হয়ে পড়ায় বহু বাড়িতে রান্না বন্ধ, বিদ্যুৎ সংযোগ নেই বললেই চলে।
কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলায় অন্তত ১৫ হাজার পরিবার পানিবন্দী। চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার জানিয়েছেন, সুরাজপুর-মানিকপুর, কাকারা, বরইতলীসহ নয়টি ইউনিয়নের প্রায় সাড়ে ছয় হাজার পরিবার প্লাবিত। মাতামুহুরীর পাঁচটি ইউনিয়নে আরও সাড়ে তিন হাজার পরিবার পানিবন্দী। পেকুয়া পৌরসভা ও পাঁচটি ইউনিয়নে পাঁচ হাজার পরিবার দুর্ভোগে পড়েছে। চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নে পাহাড়ধসে দুটি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হলেও হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে খাদ্যসহায়তা দিয়েছে প্রশাসন।
বান্দরবানে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধি এবং পাহাড়ি ঢলে জেলা শহরের আর্মিপাড়া, ক্যচিংঘাটা, বালাঘাটা ও ইসলামপুর এলাকা ডুবে গেছে। লামা উপজেলায় মাতামুহুরীর তীরবর্তী কিছু ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আলীকদম, থানচি ও রোয়াংছড়ি উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ, যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন। বান্দরবান-চিম্বুক-থানচি ও বান্দরবান-রোয়াংছড়ি সড়কের কিছু অংশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল বন্ধ। রুমা-বগালেক-কেওক্রাডং সড়কে পাহাড়ধস হয়েছে, তাই কেওক্রাডংয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এস এম হাসান বলেছেন, নিম্নাঞ্চলের কিছু জায়গায় পানি থাকলেও বৃষ্টি কমলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়কের মহালছড়ি অংশের চব্বিশ মাইল, মাইসছড়ি ও কেরেঙ্গেনালায় সড়ক তলিয়ে যান চলাচল বন্ধ। চেঙ্গী ও মাইনী নদীর পানি বাড়ছে। জেলা সদর, মহালছড়ি ও দীঘিনালার নিচু এলাকায় পানি ঢুকেছে। দীঘিনালা-লংগদু-সাজেক সড়কে যান চলাচল বন্ধ, সাজেকের মাচালং ও বাঘাইহাটে নৌকা চলছে। পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়ায় জেলা প্রশাসন ১৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে। জেলা প্রশাসক আনোয়ার সাদাত জানিয়েছেন, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে শুকনা খাবারসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখা হয়েছে এবং পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
বাঁশখালীতে পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের পানিতে নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ছনুয়া, নাপোড়া, চাম্বল, শেখেরখীল ও পুকুরিয়া ইউনিয়নের পুকুর ও ঘেরের মাছ ভেসে গেছে। খানখানাবাদ ইউনিয়নের কদমরসুল ও প্রেমাশিয়া এলাকায় বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে; বেশ কয়েকটি স্থানে বাঁধ উপচে পানি প্রবেশ করায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে। গন্ডামারা, সরল ও ছনুয়ায় তিন দিন ধরে বিদ্যুৎ নেই। সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ায় সাঙ্গু, ডলু ও টঙ্কাবতী নদীর পানি বাড়ছে। বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করায় ফসলের খেত তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা চলছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পানিবন্দী মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য মাইকিং করা হচ্ছে।




