মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষুদ্রতম দেশ বাহরাইনের অর্থনীতি বর্তমানে একাধিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি। দেশটির বৈদেশিক বিনিময় মজুদ চলতি বছরের মে মাসে ৫৬ শতাংশ কমে ১.৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যা কোভিড-১৯ মহামারির পর সর্বনিম্ন। পাশাপাশি দেশটির নামমাত্র জিডিপি ৪৮.৮৫ বিলিয়ন ডলার এবং এটি উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্যদের মধ্যে সর্বোচ্চ ঋণের বোঝা বহন করে। তিনটি প্রধান ক্রেডিট রেটিং এজেন্সির কাছ থেকে বিনিয়োগ গ্রেড রেটিং না পাওয়া একমাত্র জিসিসি দেশ এটি।

এমন প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক গতি ধরে রাখা এবং প্রবৃদ্ধির নতুন পথ খুঁজে বের করাকে সবচেয়ে জরুরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে দেশটির ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (ইডিবি)। সম্প্রতি ইডিবির প্রধান নির্বাহী নূর বিনতে আলী আলখুলাইফ যুক্তরাজ্যে পাঁচদিনের সফর শেষে ফরচুনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। এর আগে জুনের শেষ সপ্তাহে তিনি চীন ও হংকং সফর করেন, যেখানে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্ক আরও সুসংহত করার ওপর জোর দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, চীন বাহরাইনের তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার; ২০২৫ সালে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২.৪৩ বিলিয়ন ডলার।

যুক্তরাজ্য-জিসিসি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) গত মে মাসে চূড়ান্ত হওয়ায় ইডিবি এই চুক্তির সম্ভাবনাকে পুঁজি করতে আগ্রহী। বর্তমানে জিসিসির সাথে যুক্তরাজ্যের বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ৫৩ বিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ৭১ বিলিয়ন ডলার), যা এই চুক্তির ফলে ১৯.৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নূর আলখুলাইফ জানান, এফটিএ স্বাক্ষরিত হওয়ার পর একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা সামনে আসবে, তবে তার জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তিনি উৎপাদন, জ্বালানি, জীবনবিজ্ঞান ও স্বাস্থ্যসেবা খাতকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত করেন।

দেশটিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের প্রসারেও জোর দেওয়া হচ্ছে। অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস (এডব্লিউএস) এবং ওরাকল তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। এছাড়া বাহরাইনকে আঞ্চলিক ডেটা হোস্টিং হাব হিসেবে গড়ে তোলা নিয়ে আলোচনা চলমান রয়েছে। এ বছরের শুরুর দিকে ড্রোন হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের এডব্লিউএস ডেটা সেন্টার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের পরিবর্তে ডিজিটাল স্থিতিস্থাপকতা নিয়ে আলোচনা সরে এসেছে বলে মন্তব্য করেন ইডিবি প্রধান।

নূর আলখুলাইফ স্বীকার করেন যে বর্তমান যুদ্ধের প্রভাব উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা ও পর্যটন খাতে পড়লেও ইডিবির বিদ্যমান ও পরিকল্পিত বিনিয়োগে তেমন কোনো ব্যাঘাত ঘটেনি। বৈদেশিক রিজার্ভের পতন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'রিজার্ভ কমেছে সত্য, কিন্তু সংযুক্ত আরব আমিরাত এপ্রিল মাসে ৫.৪ বিলিয়ন ডলারের একটি কারেন্সি সোয়াপ লাইন বাড়িয়েছে, যা এখনও ব্যবহার করা হয়নি।' তার মতে, তাৎক্ষণিক প্রয়োজনের চেয়ে স্থানীয় বাজার, ব্যাংক ও সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি একটি অতিরিক্ত সুরক্ষা বলয় হিসেবে কাজ করছে। উপসাগরীয় দেশগুলো জানে যে ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার জন্য বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সম্প্রতি ইরানের পুনরায় হামলার ঘটনা, যা বাহরাইনসহ একাধিক জিসিসি দেশকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে, সামনের পথে সম্ভাব্য বাধাগুলো স্পষ্ট করে দিয়েছে।