চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী এলাকায় অবস্থিত ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ৯ জন শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটেছে। গতকাল শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে 'এমটি রাসি' নামক একটি স্ক্র্যাপ জাহাজের ব্যালাস্ট এলাকায় বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস ছড়িয়ে পড়লে এই দুর্ঘটনা ঘটে। জাহাজটি পূর্বে এলএনজি পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হতো এবং ২০২৫ সালের জুলাইয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পেয়ে এখানে কাটা হচ্ছিল।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, জাহাজের তলায় একটি ট্যাংকের চারপাশ কাটার কাজ শেষ করে শ্রমিকেরা ভেতরে প্রবেশ করলে প্রথম দুজন জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তাঁদের উদ্ধারে গিয়ে আরও দুজন এবং পরবর্তীতে কাটিং ফোরম্যান ও একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা অচেতন হয়ে পড়েন। এভাবে একের পর এক শ্রমিক বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শে এসে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। নিহতদের মধ্যে সীতাকুণ্ড, পাবনা ও গাইবান্ধার বাসিন্দারা রয়েছেন। বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সহকারী পরিদর্শক এস এম সাখাওয়াত হোসেন জানান, জাহাজের ভারসাম্য রক্ষার পানি রাখার স্থানে (ব্যালাস্ট এলাকা) গ্যাস জমে থাকার কারণেই এই বিপর্যয় ঘটেছে।

তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে, এই কারখানায় নিরাপত্তার অভাব দীর্ঘদিনের। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের শ্রম পরিদর্শক শাহেদ পারভেজ জানান, গত ৯ ফেব্রুয়ারি কারখানাটি পরিদর্শনের সময় শ্রমিকদের নিরাপত্তা সচেতনতার অভাব, ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রতিবেদনের অনুপস্থিতি এবং অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার বিপরীতে ওভারটাইম না দেওয়ার মতো গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়েছিল। একাধিক নোটিশের পরও যথাযথ সাড়া না পাওয়ায় গত জুলাই মাসে প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার ফেরদৌস ওয়াহিদ ও ব্যবস্থাপক মো. ইউসুফ আলীর বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলা করা হয়। মামলার এক মাসের মাথায় এই প্রাণহানির ঘটনাটি ঘটেছে, যা raises প্রশ্ন তুলেছে যে শনাক্ত হওয়া ত্রুটিগুলো সংশোধন করা হয়েছিল কি না।

দুর্ঘটনার পর কারখানার জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থার চরম অভাবের অভিযোগ তুলেছেন শ্রমিকরা। শ্রমিক মো. রফিক জানান, উদ্ধার করার পর দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া বা অক্সিজেন দেওয়ার সুযোগ ছিল না, যা প্রাণহানি কমাতে সাহায্য করতে পারত। ফায়ার সার্ভিস সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও ঘটনার শুরু হয়েছিল সকাল ৯টার দিকে। অন্যদিকে, কারখানার ব্যবস্থাপক ইউসুফ আলী নিরাপত্তার ঘাটতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং দাবি করেছেন যে সব সরঞ্জাম ব্যবহৃত হয়েছিল। তিনি জানান, নিহতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে, তবে শ্রম আদালতের মামলা সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণা নেই।

জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্ত এই ঘটনাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, সরকারি পরিদর্শনে ত্রুটি ধরা পড়ার পর তা সংশোধন হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার ছিল। তিনি এই প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলসহ দৃষ্টান্তমূলক আইনি পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান জানিয়েছেন, ঘটনার তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্তে কার গাফিলতিতে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং ভবিষ্যতে তা রোধে কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, তা খতিয়ে দেখা হবে।