রাজধানীর বছিলায় এক নির্মম হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্র ধরে গড়ে ওঠা প্রেমের সম্পর্কের জের ধরে সাজ্জাদ হোসেন (২৪) নামের এক তরুণকে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়। অভিযোগ, এই হত্যায় জড়িত ছিলেন তার প্রেমিকা সুমাইয়া তৃষ্ণা (২৬) এবং সুমাইয়ার স্বামী রোকনুজ্জামান পলাশ (২৬)। ঘটনার পর মৃতদেহটি নয়টি খণ্ডে বিভক্ত করে মুন্সিগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে ফেলে রাখা হয়েছিল বলে তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। বর্তমানে এই দম্পতি বিচারাধীন রয়েছেন এবং মামলাটি আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে আছে।
ভুক্তভোগী সাজ্জাদ সাভারের হেমায়েতপুর এলাকায় মা-বাবার সঙ্গে থাকতেন এবং রাজধানীর বনানীতে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। প্রায় এক বছর আগে ফেসবুকে সুমাইয়ার সাথে তার পরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা সুমাইয়া ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী, আর তার স্বামী রোকনুজ্জামান একই প্রতিষ্ঠানের সহপাঠী। গত বছরের ৩ এপ্রিল বছিলার একটি মেস বাসায় সাজ্জাদকে ডেকে এনে হত্যা করা হয়। পিবিআইয়ের অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, হত্যার পরিকল্পনাটি অনেক আগে থেকেই ছিল এবং এর নেপথ্যে ছিল সাজ্জাদের সাথে সুমাইয়ার সম্পর্কের টানাপোড়েন।
তদন্তে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১ মার্চ সুমাইয়া তার স্বামীর কথায় মেসেঞ্জারে 'সুপ্ত' নামের একটি আইডিতে ব্যক্তিগত ছবি পাঠান, যেটি ব্যবহার করতেন সাজ্জাদ। সেখান থেকেই তাদের কথোপকথন শুরু হয়। তদন্ত কর্মকর্তা জানান, সাজ্জাদ ও সুমাইয়ার মধ্যে প্রায় দুই মাস প্রেমের সম্পর্ক ছিল এবং তারা একাধিকবার শারীরিক সম্পর্কেও জড়ান। বিষয়টি রোকনুজ্জামান জানতে পারলে পরিস্থিতি জটিল হয়। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে ও স্বামীর আস্থা ফেরাতে সুমাইয়া হত্যা পরিকল্পনায় রাজি হন।
হত্যার দিন অর্থাৎ গত বছরের ৩ এপ্রিল, ঈদের ছুটিতে মেসে কেউ থাকবে না জেনে সুমাইয়া সাজ্জাদকে সেখানে ডেকে পাঠান। পরিকল্পনা অনুযায়ী মেসের গোসলখানায় লুকিয়ে ছিলেন রোকনুজ্জামান। সাজ্জাদ কক্ষে প্রবেশ করে সুমাইয়াকে জড়িয়ে ধরতেই পেছন থেকে ছুরিকাঘাত করে তাকে। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে সাজ্জাদ নিস্তেজ হয়ে পড়লে লাশ সরানোর চেষ্টা করেন তারা। পরে ব্যর্থ হয়ে লাশটি টুকরো করার সিদ্ধান্ত নেন। চালের বস্তা, চটের ব্যাগ ও বড় কার্টন কিনে তিনটি কার্টনে ভরে লাশের টুকরোগুলো স্কচটেপ দিয়ে মুড়িয়ে ফেলা হয়।
হত্যার পর রাতেই ৪ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে একটি প্রাইভেট কার ভাড়া করে সুমাইয়া ও রোকনুজ্জামান। তিনটি কার্টন নিয়ে তারা প্রথমে মুন্সিগঞ্জের মাওয়া যান। ফেরার পথে একটি কার্টন মুন্সিগঞ্জের পদ্মা সেতু (উত্তর) থানার মেদিনীমণ্ডল এলাকার নর্দমায় ফেলে দেওয়া হয়। বাকি দুটি কার্টন কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা ইউনিয়নের একটি নির্জন নিচু জমিতে ফেলে রেখে যান তারা। পরদিন ৪ এপ্রিল কেরানীগঞ্জে ফেলে যাওয়া একটি কার্টন থেকে কুকুর একটি পোঁটলা টেনে বের করে ছিঁড়ে ফেললে লাশের টুকরো বেরিয়ে আসে। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে সেগুলো উদ্ধার করে এবং পরে মুন্সিগঞ্জ থেকেও আরেকটি কার্টন উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধার হওয়া লাশের খণ্ডাংশ স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ফিঙ্গারপ্রিন্ট, হাড়, দাঁত ও নখের নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যায় যে এগুলো সাজ্জাদের। এদিকে, ছেলের খোঁজ না পেয়ে ঘটনার দিনই সাভার মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন সাজ্জাদের বাবা মোহাম্মদ ইউসুফ আলী। লাশ উদ্ধারের পর জিডিটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।
হত্যার পর দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন রোকনুজ্জামান ও সুমাইয়া। চুয়াডাঙ্গার জীবননগর সীমান্ত দিয়ে তারা ভারতে যাওয়ার চেষ্টা করেন। নিজেদের অবস্থান গোপন রাখতে সুমাইয়া তার ব্যবহৃত সিম ফেনীতে গ্রামের বাড়িতে রেখে দিয়ে গাবতলী হয়ে জীবননগরের উদ্দেশে রওনা হন। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তার অবস্থান শনাক্ত করে পুলিশ। এমনকি যে বাসে সুমাইয়া যাচ্ছিলেন, সেই বাসেই যাত্রীবেশে ওঠেন একজন পুলিশ সদস্য। জীবননগরে বাস থেকে নামার পর ৮ এপ্রিল রাত দেড়টার দিকে সুমাইয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে রোকনুজ্জামানকেও আটক করা হয়।
মামলার তদন্ত শেষে গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকার আদালতে রোকনুজ্জামান ও সুমাইয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেন পিবিআইয়ের ঢাকা জেলার পুলিশ পরিদর্শক জামাল উদ্দীন। অভিযোগপত্রে ৪০ জনকে সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং আগামী ৩১ আগস্ট পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ ধার্য রয়েছে। সাজ্জাদের বাবা ইউসুফ আলী বলেন, ‘আমার ছেলে খুব ভালো ছিল। ছেলের কোনো শত্রু ছিল না। আমি ছেলে হত্যার বিচার চাই।’ অপরদিকে সুমাইয়ার আইনজীবী মোজ্জাম্মেল হোসেন বলেন, মামলার পূর্ণাঙ্গ বিচারিক কার্যক্রম শুরু হলে বোঝা যাবে। তিনি দাবি করেন, অভিযোগপত্রের সঙ্গে আসামির ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দির অমিল রয়েছে।




