কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে গতকাল শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মুক্তি পান সোনা মিয়া। আদালতের নির্দেশনা পাওয়ার পর জেল কর্তৃপক্ষ সব আইনি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে তাঁকে ছেড়ে দেন। কারাগারের জেলার মো. দেলোয়ার জাহান জানান, শুক্রবার সকালে নির্দেশনা হাতে পাওয়ার পরপরই মুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তা সম্পন্ন হয়।

এর আগে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত তাঁকে চারটি কঠোর শর্তে জামিন মঞ্জুর করেন। আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (নাজির) মো. বেদারুল আলম বলেন, সোনা মিয়াকে তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও পাসপোর্ট আদালতে জমা রাখতে হবে। আদালতের অনুমতি ছাড়া ঠিকানা পরিবর্তন করা যাবে না। নির্ধারিত তারিখে আদালতে হাজিরা দিতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিজের অবস্থান সম্পর্কে অবহিত রাখতে হবে। নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তাঁর বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। প্রতি মাসের প্রথম মঙ্গলবার কক্সবাজার সদর থানায় উপস্থিত হয়ে অবস্থান নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। প্রতি তিন মাস পর থানাকে তাঁর উপস্থিতি ও অবস্থান সংক্রান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিলের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি প্রকৃত সোনা মিয়া নন; তিনি রোহিঙ্গা নাগরিক মো. রমজান। সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে নিজের পরিচয় গোপন করেন রমজান। সেই ভুয়া পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করেই মামলা, অভিযোগপত্র ও পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে যায়। কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী গত ৫ জুলাই তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, কারাগারে থাকা সোনা মিয়া ২০২০ সালের ইয়াবা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি নন। ওই মামলায় সোনা মিয়ার পরিচয় ব্যবহার করে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে রোহিঙ্গা নাগরিক মো. রমজান।

আরও জানা গেছে, ২০২২ সালের ১৩ জুন সোনা মিয়ার পরিচয় ব্যবহার করে প্রকৃত আসামি রমজান ওই মামলায় জামিন নিয়ে আত্মগোপন করেন। তাঁকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা এখনও অব্যাহত রয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে কীভাবে একজন নিরপরাধ মানুষের পরিচয় চুরি করে দীর্ঘদিন আইনি জটিলতা তৈরি করা হয়েছিল।

মামলার নথি ও আদালত সূত্রে আরও জানা যায়, ২০২০ সালে পুলিশ ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের সময় রমজান নিজেকে ‘সোনা মিয়া’ হিসেবে পরিচয় দেন এবং সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করেন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে মামলার পাঁচ আসামিকেই আদালত মৃত্যুদণ্ড দেন। গত ২৪ জুন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে প্রকৃত অপরাধী রমজানের পরিবর্তে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান সোনা মিয়া। কারাগারে যাওয়ার পর তিনি দাবি করেন, ইয়াবা মামলার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নন তিনি। কারাগার কর্তৃপক্ষও পুরোনো মামলার নথিতে থাকা ছবি, পরিচয়, মায়ের নামসহ বিভিন্ন তথ্যের সঙ্গে সোনা মিয়ার তথ্য মিলিয়ে অসংগতি খুঁজে পায়। বিষয়টি আদালতের নজরে আনা হলে জেলা ও দায়রা জজ পুলিশকে তদন্তের নির্দেশ দেন।

কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সোনা মিয়ার আইনজীবী আবদুল মান্নান বলেন, মামলার তদন্ত পর্যায়েই আসামির প্রকৃত পরিচয় যাচাই করা হয়নি। এর ফলেই একজন নিরপরাধ মানুষকে মৃত্যুদণ্ডের আসামি হিসেবে কারাগারে যেতে হয়েছে। বিষয়টি আদালতের নজরে আনার পর জামিনের আবেদন করা হয়। নথি, তদন্ত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট তথ্য পর্যালোচনা করে আদালত গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সোনা মিয়ার জামিন মঞ্জুর করেন। শুক্রবার জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বাড়ি ফেরেন পরিচয় জটিলতায় কারাভোগ করা দিনমজুর সোনা মিয়া। কারাফটকে স্বজনেরা তাঁকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেন।