নীতির প্রশ্নে মানুষ সাধারণত দুই ধরনের পরিস্থিতিতে নমনীয় হয়ে পড়ে—যখন ভুল নিজের দলের কারও হয়, অথবা যখন প্রতিপক্ষ তীব্র উসকানি দেয়। প্রথম ক্ষেত্রে নিজের লোককে রক্ষা করার প্রবণতা দেখা দেয়, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে প্রতিশোধের ন্যায্যতা খোঁজা হয়। মহানবী (সা.)-এর জীবনে এই দুই অবস্থারই স্পষ্ট উদাহরণ বিদ্যমান, এবং তিনি উভয় ক্ষেত্রেই নিজের নীতি থেকে বিচ্যুত হননি।

দ্বিতীয় ঘটনাটি হলো মিথ্যা নবী মোসাইলামার চিঠি ও দূত প্রেরণ। ইয়ামামার বনু হানিফা গোত্রের মোসাইলামা নিজেকে নবী দাবি করে মহানবীকে চিঠি লিখেছিল, যাতে নবুয়তের অর্ধেক অংশীদারিত্ব দাবি করা হয়। তার দুই দূত যখন নবীজির কাছে আসে, তখন তিনি তাদের জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমরা কি সাক্ষ্য দাও যে আমি আল্লাহর রাসুল?’ তারা জবাব দেয়, ‘আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি মোসাইলামা আল্লাহর রাসুল।’ এটি ছিল চরম উসকানি—সত্য নবীর মুখে মিথ্যা নবীর স্বীকৃতি। রাসুল (সা.) চাইলে তখনই তাদের শাস্তি দিতে পারতেন, কিন্তু তিনি বলেন, ‘দূত হত্যা নিষিদ্ধ। আল্লাহর শপথ, তা না হলে আমি তোমাদের হত্যা করতাম।’ এরপর তিনি চিঠির জবাবে লেখেন, ‘রাজ্য তো আল্লাহরই। তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তার উত্তরাধিকারী করেন। আর শুভ পরিণাম খোদাভীরুদের জন্য।’ এই ঘটনা শিক্ষা দেয় যে, নীতি মানে শুধু ন্যায্য অবস্থানে থাকা নয়, বরং সেই নীতি রক্ষার জন্য নির্ধারিত সীমা অতিক্রম না করা—যত বড় উসকানিই আসুক না কেন।

প্রথম ঘটনাটি মক্কা বিজয়ের পরবর্তী সময়ের। নবী (সা.) ইসলাম প্রচারের জন্য আশপাশের অঞ্চলে ছোট ছোট কাফেলা পাঠান। খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-কে জুজাইমা গোত্রের কাছে দাওয়াত দেওয়ার জন্য পাঠানো হয়েছিল, যুদ্ধের নির্দেশ ছিল না। জুজাইমার লোকেরা ইতিমধ্যে ইসলাম গ্রহণ করেছিল, কিন্তু ‘আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি’ কথাটি সঠিকভাবে বলতে না পেরে বলছিল ‘সবা’না, সবা’না’ (আমরা স্বধর্ম ত্যাগ করেছি)। খালিদ (রা.) ভুল বুঝে মনে করেন তারা ইসলাম প্রত্যাখ্যান করছে এবং আক্রমণ চালান। কয়েকজন নিহত হয়, বাকিরা বন্দী হয়। পরদিন খালিদ বন্দীদের হত্যার নির্দেশ দিলেও কয়েকজন সাহাবি তা মানতে অস্বীকার করেন। খবর নবীজির কাছে পৌঁছলে তিনি আকাশের দিকে হাত তুলে দুইবার বলেন, ‘হে আল্লাহ, খালিদ যা করেছে, আমি তার দায় থেকে মুক্ত।’ তিনি শুধু মৌখিক দায়মুক্তি ঘোষণায় থেমে যাননি। তিনি হজরত আলী (রা.)-কে পাঠিয়ে নিহতদের রক্তপণ ও সম্পদের ক্ষতিপূরণ নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে বেশি দিয়ে পরিশোধ করেন। যে খালিদ তাঁর অন্যতম প্রধান সেনাপতি, তাঁর ভুলও তিনি ধামাচাপা দেননি, বরং প্রকাশ্যে স্বীকার করে ক্ষতিগ্রস্তদের পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দিয়েছেন।

এই দুই ঘটনার মধ্যে একটি মিল আছে—উভয় ক্ষেত্রেই নবীজির কাছে সহজ পথ খোলা ছিল: প্রথমটিতে নীরব থাকা বা চাপা দেওয়া, দ্বিতীয়টিতে প্রতিশোধ নেওয়া। তিনি কোনোটিই বেছে নেননি। নীতিতে অবিচল থাকা মানে শুধু কঠিন সময়ে সঠিক কথা বলা নয়, নিজের মানুষের ভুলে জবাবদিহি করা আর শত্রুর উসকানিতেও সীমা না ভাঙা—এই দুই-ই সমান গুরুত্বপূর্ণ।