যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত একটি প্রাচীন কোরআন পৃষ্ঠা আবিষ্কারের পর আন্তর্জাতিক গবেষক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। রেডিওকার্বন ডেটিং পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পাণ্ডুলিপিটির সময়কাল মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনকাল বা তাঁর ওফাতের পরবর্তী সময়ের (৫৭০-৬৩২ খ্রিষ্টাব্দ) খুব কাছাকাছি। গবেষক মনির ইউসুফ তাহার মতে, বার্মিংহামের ওই দুই পৃষ্ঠার পাণ্ডুলিপি হিজরি প্রথম শতকের বার্তা বহন করে, যা ইসলামের প্রাথমিক যুগের কোরআনিক পাঠের ঐতিহাসিক নির্ভরযোগ্যতাকে আরও শক্তিশালী করে। অন্যদিকে, মিসরে হিজরি ২২ সালে (৬৪৩ খ্রিষ্টাব্দ) আবিষ্কৃত দুটি আরবি প্যাপিরাস থেকে জানা যায়, সে সময় আরবি ভাষার লিখিত ব্যবহার প্রশাসনিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে সুসংহত ছিল। একটি প্যাপিরাসে রাজস্ব আদায়ের হিসাব এবং অপরটিতে গ্রিক-আরবি দ্বিভাষিক রসিদে মুসলিম সেনাবাহিনীর জন্য ভেড়া সরবরাহের বিবরণ রয়েছে। এ থেকে প্রমাণিত হয়, ইসলামের সূচনালগ্নেই একটি সুসংগঠিত লিখিত ভাষার বিকাশ ঘটেছিল, যা কোরআনের লিপি সংরক্ষণে সহায়ক হয়েছিল।
কোরআনের প্রাচীন পাণ্ডুলিপির অনুসন্ধানে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে ১৮৬৯ সালে মধ্য এশিয়ার সমরখন্দে। সেখান থেকে উদ্ধার হয় একটি বিরল ও সুবিশাল পাণ্ডুলিপি, যা পরবর্তীকালে রুশ তুর্কিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল কার্ল ফন কফম্যান সেন্ট পিটার্সবার্গের ইম্পেরিয়াল পাবলিক লাইব্রেরিতে স্থানান্তর করেন। ১৯২৮ সালে কায়রো থেকে প্রকাশিত আল-ইখা সাময়িকীর এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, পাণ্ডুলিপিটি ১৪০৩ খ্রিষ্টাব্দে এশিয়া মাইনরের এক আলেম তুর্কিস্তানী বুজুর্গ খাজা আহরারকে উপহার দিয়েছিলেন। পরে শাসক তৈমুর লং এটি মধ্য এশিয়ায় নিয়ে আসেন। বহু শতাব্দী ধরে এই পাণ্ডুলিপি খোলাফায়ে রাশেদিনের তৃতীয় খলিফা ওসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর নিজস্ব হস্তলিখিত ‘মসহাফ-ই উসমানী’ হিসেবে খ্যাত ছিল। রুশ ইম্পেরিয়াল আর্কিওলজিক্যাল সোসাইটির গবেষক অধ্যাপক শেবুতিন দীর্ঘ গবেষণার পর সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, পাণ্ডুলিপিটি হিজরি প্রথম শতক বা সর্বোচ্চ হিজরি দ্বিতীয় শতকের (৭৩২-৮১৪ খ্রিষ্টাব্দ) শুরুতে লিখিত। ফলে প্রাচীন আরবি ক্যালিগ্রাফি ও লিখনরীতি বিশ্লেষণের জন্য এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক দলিল হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লবের সময় রুশ সাম্রাজ্যের মুসলিম জনগোষ্ঠী সেন্ট পিটার্সবার্গে রাখা এই উসমানী পাণ্ডুলিপি ফেরত দেওয়ার দাবি জানায়। প্রশাসন পাণ্ডুলিপিটি তুর্কিস্তানে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য হস্তান্তর করলেও, দীর্ঘ পথযাত্রার এক অজানা স্থানে এটি রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যায়। পরবর্তীতে শত অনুসন্ধান করেও এর কোনো সন্ধান মেলেনি, যা বিশ্বসভ্যতার জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। তবে এর আগে ১৯০৪ সালের ২৬ মে সেন্ট পিটার্সবার্গের আর্কিওলজিক্যাল সোসাইটির তত্ত্বাবধানে মূল পাণ্ডুলিপিটির একটি হুবহু ফ্যাঙ্কসিমিলি বা আলোকচিত্রভিত্তিক রঙিন প্রতিলিপি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বিশিষ্ট রুশ প্রাচ্যবিদ এস. পিসারেভ ১৯০৫ সালে এই প্রতিলিপিটি নিখুঁতভাবে মুদ্রণ করেন। প্রতিটি আয়াতের বিরতি, লিপির হরফ ও মূল রঙের সূক্ষ্ম তারতম্য বজায় রেখে ৩৫৩ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থের প্রতিটি পৃষ্ঠার পরিমাপ ছিল ৬৯ × ৯০ সেন্টিমিটার এবং ওজন প্রায় ১৮ কেজি। মোট ৫০টি কপি প্রকাশিত হয়েছিল, যার ২৫টি গবেষক ও রাজকীয় সংগ্রহশালার জন্য সংরক্ষিত ছিল এবং বাকি ২৫টি ১০০ পাউন্ড মূল্যে সর্বসাধারণের জন্য বিক্রি করা হয়। ফ্যাঙ্কসিমিলির প্রথম পৃষ্ঠায় রুশ ও ফরাসি ভাষায় লেখা ছিল, “সমরখন্দের পবিত্র কোরআন, যা খলিফা উসমান (৬৪৪-৬৬৫ খ্রি.)-এর মূল হস্তলিখিত কপি থেকে ১৯০৫ সালে হুবহু প্রতিচ্ছবি হিসেবে মুদ্রিত হয়েছে।” সূত্র: ইসলাম অনলাইন ডটকম।




