মক্কার কোরাইশরা ঘোষণা দিয়েছিল, নবী মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর সঙ্গী আবু বকরকে জীবিত অথবা মৃত ধরতে পারলে ১০০টি লাল উট পুরস্কার দেওয়া হবে। তৎকালীন আরবে এই পুরস্কারের মূল্য আজকের কোটি টাকার সমতুল্য ছিল। প্রলোভনে বিভোর হয়ে বহু যুবক মরুভূমি চষে বেড়াতে থাকে। তাদের মধ্যে ছিলেন সুরাকা ইবনে মালিক ইবনে জুশুম আল-মুদলিজি, যিনি পদচিহ্ন দেখে নিখুঁতভাবে পথ অনুসরণে পারদর্শী ছিলেন। একদিকে কোরাইশদের দেওয়া পুরস্কারের লোভ, অন্যদিকে মরুভূমিতে অলৌকিক অভিজ্ঞতা—হিজরতের ইতিহাসে এই অধ্যায় চিরন্তন শিক্ষণীয়।
সুরাকা যখন জানতে পারেন মরুভূমির অচেনা পথে দুজনকে হেঁটে যেতে দেখা গেছে, তখন তিনি নিজ গোত্রকে এড়িয়ে নিঃশব্দে উটের পিঠে চড়ে সেই পথে যাত্রা করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল একাই বিশাল পুরস্কার নিজের করে নেওয়া। দ্রুতগতিতে অশ্ব ছুটানোর সময় একপর্যায়ে তিনি দূর থেকে নবী ও তাঁর সঙ্গীকে স্পষ্ট দেখতে পান। পেছনে ঘোড়ার খুরের আওয়াজ শুনে আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হয়ে বলেন, “হে আল্লাহর রাসুল, দুশমন আমাদের ধরে ফেলল!” নবী (সা.) প্রগাঢ় আত্মবিশ্বাস ও শান্ত কণ্ঠে উত্তর দেন, “চিন্তা কোরো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন” (সুরা তওবা, আয়াত: ৪০; সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৬৫৩)।
সুরাকা যখন তীর নিক্ষেপের দূরত্বে পৌঁছান, তখন নবী (সা.) মোনাজাতে হাত তুলে দোয়া করেন, “আল্লাহুম্মাকফিনিহিম বিমা শি’ত” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩০০৫)। ঠিক সেই মুহূর্তে এক অলৌকিক ঘটনা ঘটে—সুরাকার ঘোড়ার চারটি পা শক্ত পাথুরে জমিনে দেবে যায় এবং তিনি সশব্দে মাটিতে আছড়ে পড়েন। বারবার ঘোড়াকে টেনে তোলার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন। প্রতিবার ঘোড়ার পা জমিন থেকে উঠলে সেখান থেকে ধোঁয়ার মতো ধূলিঝড় আকাশে উড়তে থাকে (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/২৪৫)।
সুরাকা বুঝতে পারেন এই পথিকের পেছনে এমন ঐশ্বরিক শক্তি রয়েছে যা কোনো পার্থিব অস্ত্র দিয়ে পরাস্ত করা সম্ভব নয়। তিনি চিৎকার করে বলেন, “হে মুহাম্মদ, আপনার প্রতিপালকের কাছে দোয়া করুন যেন আমি এই সংকট থেকে মুক্তি পাই। আমি শপথ করছি, আর আপনাদের কোনো ক্ষতি করব না এবং পেছনের ধাওয়াকারীদের ফিরিয়ে দেব।” নবী (সা.) দোয়া করলে সুরাকার ঘোড়া মুক্ত হয়ে যায়। এমনকি নবী (সা.) তাঁকে ভবিষ্যত জীবনের সুসংবাদ দিয়ে বলেন, “সুরাকা, কেমন লাগবে তোমার, যখন তোমার হাতে পারস্য সম্রাট কিসরার স্বর্ণবালা পরিয়ে দেওয়া হবে?” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৯০৬)। সুরাকা স্তম্ভিত হয়ে জিজ্ঞেস করেন, “আপনি কি পারস্য সম্রাট কিসরা ইবনে হরমুজের স্বর্ণবালার কথা বলছেন?” নবী (সা.) হাসিমুখে জবাব দেন, “হ্যাঁ, সেই কিসরারই!” (আতিয়া ইবনে মুহাম্মদ সালিম, দুরুসুল হিজরাহ, ১/৪২)।
সুরাকা নবীজির কাছে নিরাপত্তার লিখিত চুক্তি চান। নবীজির নির্দেশে আবু বকর (রা.) চামড়ার টুকরায় তা লিখে দেন। সুরাকা ফিরে গিয়ে মক্কামুখী পথের সব সন্ধানী দলকে বলেন, “আমি এদিকের সব এলাকা খুঁজে দেখেছি, সেখানে কেউ নেই!” যে ব্যক্তি সকালে শত্রু হিসেবে এসেছিলেন, সন্ধ্যায় তিনি নবীজির গোপন রক্ষকে পরিণত হন।
হিজরতের আট বছর পর মক্কা বিজয়ের দিন সুরাকা ইসলাম গ্রহণ করেন এবং নবীজির কাছে সেই পুরনো চামড়ার কাগজ প্রদর্শন করেন। তবে নবীজির ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবায়িত হয় দ্বিতীয় খলিফা ওমরের (রা.) খেলাফতকালে, যখন মুসলিম বাহিনী পারস্য সাম্রাজ্য জয় করে। পারস্য রাজপ্রাসাদের বিপুল ধনরত্ন, কিসরার মুক্তাখচিত রাজমুকুট ও স্বর্ণবালা মদিনার মসজিদে নববিতে আনা হয়। ওমর (রা.) সম্পদের দিকে তাকিয়ে কাঁদছিলেন এবং বলছিলেন, “যে জাতি এই বিপুল সম্পদ পাওয়ার পরও খেয়ানত করেনি, তারা নিশ্চিতভাবেই আমানতদার।” তারপর তাঁর মনে পড়ে হিজরতের দিনে নবীজির প্রতিশ্রুতির কথা। তিনি সুরাকাকে ডেকে আনেন এবং পারস্য সম্রাটের স্বর্ণের জামা, রত্নখচিত মুকুট ও ঐতিহাসিক স্বর্ণবালা পরিয়ে দেন। মরুভূমির এক সাধারণ বেদুইন কিসরার রাজকীয় পোশাকে সজ্জিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য দেখে সাহাবিদের চোখে অশ্রু নেমে এসেছিল (মুহাম্মদ আল-সাইয়িদ আল-ওয়াকিল, আল-হিজরাতুন নাবাবিয়্যাহ, পৃ. ১২৫)।




