গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় ১৫৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। শনিবার রাত ১২টা থেকে রবিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ৭৬ মিলিমিটার এবং এরপর আরও ৮২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। এই অতিবৃষ্টির ফলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সড়কে যানবাহন বিকল হয়ে পড়েছে এবং পথচারীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। নিউমার্কেট, নীলক্ষেত ও ঢাকা কলেজ এলাকায় সড়ক ও ফুটপাতের সীমানা বোঝা দায় হয়ে পড়ে। নিউমার্কেটের সব দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয় এবং দুর্ঘটনা এড়াতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের উদ্যোগে পরীক্ষা স্থগিত ও ক্লাস বাতিল করে ছুটি দিতে বাধ্য হয়। মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, শ্যামপুরসহ অন্তত ২০টি এলাকায় পানি জমে থাকে। বিশেষ করে গ্রিন রোড, পান্থপথ, কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণি, বনানী, বারিধারা, বাড্ডা, খিলগাঁও, মগবাজার, কাজীপাড়া, মিরপুর, নিউমার্কেট, আজিমপুর, মতিঝিল ও কদমতলী এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এ সময় সড়কে জমে থাকা পানিতে কিশোররা ফুটবল খেলায় মেতে ওঠে।

জলাবদ্ধতা নিরসনে অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দশকে অন্তত ২ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৫-১৬ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি নালা নির্মাণ ও সংস্কারে ৬০৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা এবং উত্তর সিটি ৭১১ কোটি টাকা খরচ করে। এছাড়া ওয়াসা প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয় করে। ২০২০ সালের শেষে ওয়াসার কাছ থেকে দায়িত্ব নেওয়ার পর পরবর্তী চার বছরে দুই সিটি আরও অন্তত ৭৩০ কোটি টাকা ব্যয় করে। অর্থাৎ মোট ব্যয়ের পরিমাণ ২ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। তবে এই বিপুল ব্যয় সত্ত্বেও জলাবদ্ধতা সমস্যা দূর হয়নি। গতকালের বৃষ্টিতে দেখা গেছে, অনেক এলাকা দীর্ঘ সময় পানি জমে ছিল। উত্তর সিটির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান যত্রতত্র ময়লা ফেলায় নালা বন্ধ হয়ে যাওয়াকে জলাবদ্ধতার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তবে তিনি এর আগে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নালা ও খালের পানিপ্রবাহ শতভাগ সচল রাখার নির্দেশ দিলেও তা কার্যকর হয়নি।

নগর পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, ঢাকায় পানি নিষ্কাশনের সমন্বিত মহাপরিকল্পনার অভাব রয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খানের মতে, বিচ্ছিন্নভাবে প্রকল্প নিয়ে কাজ করলে সমাধান সম্ভব নয়। পানি যেখানে গিয়ে পড়ার কথা, সেই আউটলেট সচল রাখতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, শুধু যেখানে পানি জমে সেখানে নালা তৈরি করে স্থায়ী সমাধান হবে না। দক্ষিণ সিটির প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান জানান, বর্তমান ব্যবস্থায় ৩০ মিলিমিটার বৃষ্টি পর্যন্ত তাৎক্ষণিক এবং ৫০ মিলিমিটার পর্যন্ত দুই ঘণ্টায় পানি সরানো সম্ভব। কিন্তু গতকালের বৃষ্টি সেই সক্ষমতার কয়েক গুণ ছিল। তবে বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, অতিবৃষ্টি ঢাকার জন্য নতুন নয়; এত টাকা খরচের পরও সেই প্রস্তুতি কেন নেওয়া হলো না।

নিউমার্কেট এলাকার জলাবদ্ধতা সমাধানে গাফিলতির উদাহরণ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আগে ওই এলাকার পানি পিলখানার একটি নালা দিয়ে বুড়িগঙ্গা নদীতে যেত। ২০০৯ সালের পর নিরাপত্তার কারণে সেই পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু বিকল্প কোনো স্থায়ী পথ তৈরি হয়নি। ফলে বৃষ্টি বেশি হলেই ওই এলাকা প্লাবিত হয়। ভাড়ায় মোটরসাইকেলচালক সোহরাব সরদারের মতো সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। তিনি কাজীপাড়া এলাকায় মোটরসাইকেল ঠেলে মগবাজারে যাচ্ছিলেন। তার মোটরসাইকেলে পানি ঢুকে বিকল হয়ে যায়। সেদিন তিনি মাত্র ৩০০ টাকা আয় করেছিলেন, যা পরে মোটরসাইকেল মেরামত করতে খরচ হয়ে যায়। তিনি জানান, পানির কারণে আর রাস্তায় নামা সম্ভব হয়নি। দক্ষিণ সিটির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম স্বীকার করেন, অতীতে মন্ত্রী ও মেয়রদের বক্তব্য বাস্তবসম্মত ছিল না। তাঁর মতে, স্থায়ী সমাধানের জন্য পানি নিষ্কাশনের পথ বাড়ানো প্রয়োজন। গতকাল রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত ঢাকার অনেক এলাকায় পানি জমে ছিল। নগরবাসীর দাবি, বিগত বছরগুলোর মতো অপরিকল্পিতভাবে টাকা ঢেলে নয়, বরং সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান চাই।