বাংলাদেশে বজ্রপাত এখন আর কেবল প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, এটি একটি প্রাণঘাতী দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, গত এক দশকে দেশে বজ্রপাতে প্রাণ গেছে সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষের। ২০২৫ সালেই মারা গেছেন দুই শতাধিক, যাদের একটি বড় অংশ কৃষক। ধান কাটা, সেচের কাজ বা গরু আনতে গিয়ে খোলা মাঠেই ঝড়ের কবলে পড়েছিলেন তারা। সিলেটের হাওর অঞ্চলে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি—সেখানে বিশাল জলভাগ থেকে জলীয় বাষ্প দ্রুত মেঘ তৈরি করে এবং প্রান্তরে আশ্রয় নেওয়ার জায়গাও কম।

এমন পরিস্থিতিতে বজ্রপাতের সময় করণীয় নিয়ে অনেকের মধ্যেই ভুল ধারণা রয়েছে। একসময় কিছু বইয়ে বলা হতো, বজ্রপাতের সময় মাটিতে শুয়ে পড়া নিরাপদ। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি সঠিক নয়; বরং শুয়ে পড়লে ঝুঁকি আরও বাড়ে। মেঘ থেকে বিদ্যুৎ নামার সময় সবচেয়ে কম বাধার পথ খোঁজে এবং গাছ, খুঁটি বা উঁচু স্থানে প্রথম আঘাত হানে। তবে সরাসরি বজ্রপাতের চেয়েও বেশি মানুষ মারা যায় ‘গ্রাউন্ড কারেন্ট’ বা ভূমিপ্রবাহে। কাছাকাছি বজ্রপাত হলে বিদ্যুৎ মাটির ভেতর দিয়ে ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়ে। শরীরের দুটি অংশ যদি মাটির দুটি ভিন্ন বিন্দু স্পর্শ করে এবং ওই বিন্দুদুটিতে বিদ্যুতের পরিমাণে পার্থক্য থাকে, তা হলে বিদ্যুৎ শরীরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়, যা ‘স্টেপ ভোল্টেজ’ নামে পরিচিত। শুয়ে পড়লে মাথা থেকে পা পর্যন্ত পুরো শরীর মাটি স্পর্শ করে, ফলে দুই বিন্দুর দূরত্ব বেড়ে যায়। এতে ভোল্টেজের পার্থক্যও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিপরীতে, দুই পা জোড়া করে দাঁড়ালে এই দূরত্ব সবচেয়ে কম থাকে। এই কারণেই বিশেষজ্ঞরা শুয়ে পড়ার পরিবর্তে পা গুটিয়ে বসার বা পা জোড়া করে দাঁড়িয়ে থাকার পরামর্শ দেন।

তবে কেবল বসে থাকা বা দাঁড়িয়ে থাকাকেও সম্পূর্ণ নিরাপদ বলা যাবে না। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আবহাওয়া দপ্তর স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, খোলা জায়গায় বজ্রপাত থেকে বাঁচার কোনো নিশ্চিত উপায় নেই। বিশেষজ্ঞদের দেওয়া পদ্ধতিগুলো শুধু ঝুঁকি কমানোর শেষ চেষ্টা, যখন আর আশ্রয়ে পৌঁছানো সম্ভব নয়। সঠিক পদ্ধতি হলো ঝড় শুরুর আগেই নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়া। ‘৩০-৩০’ নিয়মটি এ ক্ষেত্রে কাজে লাগে। বিদ্যুৎ চমকানোর পর গর্জন শুনতে ৩০ সেকেন্ডের কম সময় লাগলে বুঝতে হবে ঝড় কাছে চলে এসেছে, এখনই নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হবে। শেষ গর্জনের পর অন্তত ৩০ মিনিট অপেক্ষা করে তবেই বাইরে বের হওয়া উচিত।

নিরাপদ আশ্রয় বলতে শক্ত দেয়াল ও ছাদযুক্ত পাকা ঘর অথবা ধাতব শরীরের গাড়ি বোঝানো হয়েছে। টিনের চাল বা খোলা শেড নিরাপদ নয়। মাঠে খেলাধুলা বা কাজ করার সময় ঝড়ের আভাস পেলে দ্রুত কাছের পাকা ভবনে চলে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। একলা গাছের নিচে দাঁড়ানো সবচেয়ে বিপজ্জনক ভুলগুলোর একটি, কারণ গাছ আঘাত পেলে তার গা বেয়ে বা চারপাশের মাটি দিয়ে বিদ্যুৎ ছড়িয়ে পড়ে। পানিতেও নামা উচিত নয়, কারণ পানি বিদ্যুতের সহজ মাধ্যম। ছাতা, ধাতব বেড়া, সাইকেল বা মোটরসাইকেলের হাতল এসবও তখন বিপজ্জনক হতে পারে।

যদি আশ্রয় বলতে কিছু না থাকে—না পাকা ঘর, না গাড়ি, শুধু খোলা মাঠ আর মাথার ওপর গর্জনরত মেঘ—তখন শুয়ে না পড়ে পা জোড়া করে গুটিয়ে বসে পড়তে হবে। হাত দুটি দিয়ে কান চাপা দিতে হবে এবং মাটির সংস্পর্শ যতটা সম্ভব কম রাখতে হবে। চোখ রাখতে হবে কাছাকাছি কোনো পাকা ছাদের দিকে। তবে মনে রাখতে হবে, এটা নিরাপদ অবস্থান নয়, বরং আশ্রয়ে পৌঁছানোর জন্য একটি অস্থায়ী পদক্ষেপ।