দেশের জ্বালানি খাত চরম অস্থিরতার মধ্যে পড়েছে। গ্যাস সংকট ও বিদ্যুৎ লোডশেডিংয়ের জেরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বিভিন্ন অঞ্চলের পরিস্থিতি। গতকাল সকালে চট্টগ্রাম নগরের ষোলশহর এলাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকরা দীর্ঘ অপেক্ষার পর গ্যাস না পেয়ে সড়ক অবরোধ করেন। ফসিল ফিলিং স্টেশনের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও জ্বালানি না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ চালকরা রাস্তায় নেমে আসেন। পুলিশের অনুরোধে অবশ্য কিছুক্ষণ পর তারা সড়ক ছেড়ে দেন। এক চালক মোহাম্মদ হানিফ জানান, ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে গাড়ি নিয়ে লাইনে রয়েছেন; কবে গ্যাস পাবেন, তা কেউ বলতে পারছে না। এই অবস্থায় পরিবার নিয়ে কীভাবে চলবেন, তা নিয়েই তাঁর চরম দুশ্চিন্তা। ফিলিং স্টেশনের এক কর্মকর্তা জানান, সরবরাহ না থাকায় সিএনজি অটোরিকশায় গ্যাস তোলা সম্ভব হচ্ছে না; সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তাদের কিছু করার নেই।

এদিকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো। তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে গ্রাহকদের ক্ষোভ চরমে ওঠায় জামালপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি জেলা প্রশাসকের কাছে চিঠি দিয়ে বিদ্যুৎ অফিস, উপকেন্দ্র ও কর্মীদের নিরাপত্তা জোরদারের অনুরোধ জানিয়েছে। সমিতির আওতায় বিদ্যুতের গড় চাহিদা ১৭০ মেগাওয়াট; বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে মিলছে মাত্র ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ। ফলে প্রতিদিন ৯০ থেকে ৯৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে, আর গ্রাহকরা ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় থাকছেন। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সামাজিক মাধ্যমে গ্রাহকদের বিরূপ প্রতিক্রিয়া বাড়ছে; যেকোনো সময় পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়ে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে। তাই নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। ইসলামপুরের বাসিন্দা মিজানুর রহমান জানান, ২৪ ঘণ্টায় মাত্র চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পান; ৩০ মিনিট বিদ্যুৎ থাকে, তারপর কয়েক ঘণ্টা অন্ধকারে থাকতে হয়।

জয়পুরহাটেও একই চিত্র। জেলায় বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৭২ মেগাওয়াট, কিন্তু সরবরাহ মিলছে মাত্র ২৬ থেকে ২৮ মেগাওয়াট। ফলে দিন-রাতে দীর্ঘ সময় লোডশেডিং চলছে। এই পরিস্থিতিতে পাঁচটি উপজেলার ১০টি উপকেন্দ্রের নিরাপত্তা জোরদারের অনুরোধ জানিয়ে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে চিঠি দিয়েছে জয়পুরহাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। পাশাপাশি পাঁচবিবি উপজেলার শ্রীমন্তপুরে সমিতির এক মিটার রিডারকে মারধরের ঘটনাও ঘটেছে। এতে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। সমিতির মহাব্যবস্থাপক মাহবুবুল হক জানান, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অর্ধেকেরও কম; এ নিয়ে তাদের কিছু করার নেই।

গ্যাস সংকট দেশজুড়ে ক্রমশ প্রকট হচ্ছে। তিন সপ্তাহের বেশি ধরে রান্নার চুলা, শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। পরিস্থিতি আরও জটিল করে সামিটের টার্মিনাল থেকে এলএনজি সরবরাহ গত বৃহস্পতিবার বিকেলে বন্ধ হয়ে যায়। তবে গতকাল সন্ধ্যায় বঙ্গোপসাগরে এলএনজি নিয়ে একটি নতুন জাহাজ পৌঁছেছে; আজ সকালের মধ্যে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ বাড়তে শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে। কিন্তু কারিগরি ত্রুটির কারণে গতকাল বিকেল চারটায় বন্ধ হয়ে যায় এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল; রাত আটটা পর্যন্ত এটি সরবরাহ শুরু করতে পারেনি। এতে সেই সময় সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে; এক্সিলারেটের সক্ষমতা ৬০ কোটি ঘনফুট আর সামিটের ৫০ কোটি ঘনফুট। গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনায় এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হলে সংকট বাড়ে। দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের এক নম্বর ইউনিটও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে; এতে উত্তরাঞ্চলে লোডশেডিং আরও বেড়েছে।