প্রায় চার দশক ধরে বিজ্ঞানীদের গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর আলাবামার একটি স্থানে মিলেছে এক চমকপ্রদ আবিষ্কার। হান্টসভিলে অবস্থিত একটি সেনাঘাঁটির অভ্যন্তরে ববক্যাট গুহায় সম্প্রতি বিরল এক গুহামাছের খোঁজ পাওয়া গেছে, যা দেখতে ফ্যাকাশে, চক্ষুহীন এবং আকারে বেশ বড়।
বিজ্ঞানীরা প্রতি মাসে নিয়মিতভাবে এই গুহায় জরিপ চালান, যেখানে আগে থেকেই বিরল জাতের চিংড়ি ও অন্যান্য প্রাণীর বসতি ছিল। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক অনুসন্ধান অভিযানের সময় তারা হঠাৎ করেই এই অনন্য মাছটির দেখা পান। এর দেহগঠন দেখেই গবেষকদের মনে সন্দেহ জাগে যে এটি একটি অনাবিষ্কৃত প্রজাতি হতে পারে। পরবর্তী পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সেই ধারণা সত্য প্রমাণিত হয় এবং জানা যায় যে, এই মাছটি শুধু ওই একটি নির্দিষ্ট গুহাব্যবস্থাতেই বাস করে।
বিজ্ঞানীরা তাদের পর্যবেক্ষণ নিয়ে একটি নিবন্ধ সম্প্রতি সায়েন্টিফিক রিপোর্টস জার্নালে প্রকাশ করেছেন। আলাবামা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ম্যাথিউ নিমিলা প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন যে, মাছটিকে দেখে প্রথমে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। গুহামাছেদের বহির্গঠনে অনেক ধরনের বৈচিত্র্য থাকে, তবে জিনগতভাবে প্রায় সময়ই তারা অভিন্ন প্রজাতির। কিন্তু গভীর বিশ্লেষণ শেষে নিশ্চিত হওয়া যায় এটি সত্যিই একটি অভিনব প্রজাতি।
মাছটির শারীরিক গঠন অনন্য। অন্যান্য প্রজাতির সঙ্গে এর পাখনার বিস্তারে ভিন্নতা রয়েছে, মাথার পেছনে একটি কুঁজ দেখা যায় এবং এতর মুখের থুতনি লম্বা ও চ্যাপ্টা। নিউমিলা জানান, এই বৈশিষ্ট্যগুলো শুধুমাত্র কোনো একটি অঙ্গে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সম্পূর্ণ শরীরেই স্পষ্ট ছিল। সংগৃহীত নমুনার উপর সিটি স্ক্যান ও জিনগত বিশ্লেষণ চালিয়ে বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
গবেষক দল এই অদ্ভুত প্রাণীটির নামকরণ করেছেন জনপ্রিয় টেলিভিশন সিরিজ ‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’-এর দানব ‘ডেমোগর্গন’-এর অনুপ্রেরণায়। মাছটির বৈজ্ঞানিক নাম রাখা হয়েছে ডেমোগর্গনইকথিস আরকানাস। তাদের ভাষ্যমতে, লাতিন শব্দ ‘আরকানাস’-এর অর্থ ‘লুকানো’, যা নিছক অন্ধকারে বসবাসরত অচেনা এই অন্ধ প্রাণীর জন্য যথার্থ হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোনাথন আর্মব্রাস্টার এদের খাদ্যাভাস সম্পর্কে বলেন, গুহার গভীরে প্রতিদিন খাদ্য জোটে না। তাই ছোট যেকোনো প্রাণীকে গিলে ফেলার যোগ্যতা এদের আছে। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, এই মাছ শুধু নতুন একটি প্রজাতিই নয়, এটি গুহামাছের একটি সম্পূর্ণ নতুন বংশধারার অস্তিত্বের পরিচয় বহন করে।
অনেকে মনে করেন দৃষ্টিশক্তি হারানো এসব মাছ দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে আর্মব্রাস্টারের ব্যাখ্যা ভিন্ন। তার মতে, ভূগর্ভস্থ রুক্ষ পরিবেশের সঙ্গে নিজেদেরকে আশ্চর্য দক্ষতায় খাপ খাইয়ে নেওয়ার ফলেই এরা টিকে আছে এবং এখানেই এদের বিশেষত্ব।
মাছটি যে একমাত্র নির্দিষ্ট গুহা ব্যবস্থায় পাওয়া গেছে, সেটি বিরলতাকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেছে। তবে তাদের আবাস্থল একটি সরকারিভাবে সংরক্ষিত অঞ্চলের আওতায় থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বিপদের আশঙ্কা নেই। আর্মব্রাস্টার উল্লেখ করেন, বিপন্ন আলাবামা কেভ শ্রিম্প-এর উপস্থিতির কারণেও আগে থেকেই ওই এলাকায় সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। পাশের নগরীর সম্প্রসারণের ফলে ভবিষ্যতে ভূগর্ভস্থ পানি দূষণ কিছুটা শঙ্কার কারণ হতে পারলেও বর্তমানে মাছগুলো নিরাপদ বলেই বিজ্ঞানীরা মত দেন।




