সম্প্রতি জার্মানির ড্রেসডেন শহর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন এক বাঙালি পরিবার। ‘এলবে নদীর ফ্লোরেন্স’ নামে পরিচিত এই শহরটি স্যাক্সনি রাজ্যের রাজধানী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বোমা হামলায় প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়া ড্রেসডেন পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে আবার নিজের গৌরব ফিরে পেয়েছে। শহরের বারোক স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনের উজ্জ্বল উদাহরণ।
বার্লিন থেকে ড্রেসডেনের দূরত্ব প্রায় আড়াই ঘণ্টার বাসযাত্রা। দ্বিতল, প্রশস্ত বাসে ওয়াই-ফাই ও টয়লেটের সুবিধা ছিল। রাস্তা মসৃণ ও ট্রাফিকমুক্ত ছিল। পথের দুই পাশে বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ, ফসলের খেত, লাল টালির ঘরবাড়ি ও গির্জার চূড়া চোখে পড়ে। মাঝে মাঝে বিশাল উইন্ড টারবাইন দেখা গেছে, যা জার্মানির নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের প্রতীক। পরিবেশ অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ও শান্ত।
ড্রেসডেনে পৌঁছে ভাগ্নি জুঁই ও তার স্বামী ফয়সালের সাথে দেখা হয়। ফয়সাল একটি বহুজাতিক সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিতে প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত। তিনি অল্প সময়ের মধ্যে জার্মান ভাষা ও নাগরিকত্ব অর্জন করেছেন। তাদের তিন বছরের কন্যা সাফিয়ার সাথে পরিচয় হয়। সাফিয়ার ব্ল্যাকবোর্ডে একসঙ্গে ছবি আঁকা হয়।
শহর ভ্রমণের শুরুতেই লেখক এলজিবিটি প্যারেডের মুখোমুখি হন। ৬ জুন অলমার্কেটে এই আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। রঙিন পোশাক ও ব্যানার নিয়ে শত শত মানুষ অংশ নেয়। এটি লেখকের সংস্কৃতির সাথে ভিন্ন হওয়ায় কিছুটা বিব্রতকর মনে হলেও তারা এটিকে স্থানীয় সমাজের অংশ হিসেবে মেনে নেন। পুরো শহর ছিল উৎসবমুখর।
অল্টস্টাড বা পুরোনো শহর এলাকাটি যেন একটি জীবন্ত জাদুঘর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপত্য অত্যন্ত যত্নে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। ব্রুথাল ট্যারাস, যা ‘ইউরোপের বারান্দা’ নামে পরিচিত, এলবে নদীর পাড়ে অবস্থিত। আঠারো শতকে এটি রাজকীয় প্রাসাদের অংশ ছিল। বর্তমানে এটি পর্যটকদের হাঁটার ও ছবি তোলার জন্য উন্মুক্ত। এখান থেকে নদী ও শহরের দৃশ্য অপরূপ।
জিউইঙ্গার প্যালেস ড্রেসডেনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। অগাস্টাস দ্য স্ট্রংয়ের আমলে নির্মিত এই প্রাসাদ বারোক স্থাপত্যের উৎকৃষ্ট নিদর্শন। ভেতরের আঙিনা, ফোয়ারা ও সূক্ষ্ম কারুকাজ দর্শনীয়। প্রাসাদে অবস্থিত আর্ট গ্যালারিতে রাফায়েলের ‘সিস্টিন ম্যাডোনা’সহ রেমব্রান্ট ও ভার্মিয়ারের মতো বিশ্বখ্যাত শিল্পীদের চিত্রকর্ম সংরক্ষিত রয়েছে।
সাফিয়ার সাথে স্যুভেনির কেনা, চিজের দোকানে নানা স্বাদ গ্রহণ ও কফি ব্রেক—এই ছোট মুহূর্তগুলো ভ্রমণকে স্মরণীয় করে তোলে। বিদায়ের সময়ে পরিবারের স্নেহ ও আতিথেয়তা লেখকের হৃদয়ে দাগ কাটে। এলবে নদীর অপর পাড় দেখা হয়নি, যা পরবর্তী সফরের অপেক্ষা তৈরি করে। লেখকের মতে, ড্রেসডেন শুধু ইট-পাথরের শহর নয়, এটি মানুষের ভালোবাসা ও পুনর্জন্মের গল্প।


