জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, বিএনপির প্রতিশ্রুতি ছিল জনগণের সরকার গঠনের, কিন্তু বাস্তবে গড়ে উঠছে অলিগার্কদের সরকার। বুধবার সন্ধ্যায় গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি এই মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, সরকারের প্রথম দায় জনগণের প্রতি, কোনো ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর প্রতি নয়—এই সহজ সত্যটি পতিত ফ্যাসিস্ট সরকার ভুলে গিয়েছিল এবং বিএনপি সরকারও সেদিকে এগোচ্ছে। নাহিদ ইসলাম সতর্ক করে বলেন, মাফিয়া তোষণের মূল্য বাংলাদেশ ইতিমধ্যে একবার দিয়েছে, এবারের ভুল, ব্যর্থতা ও অলিগার্ক তোষণের নীতি এনসিপি রুখে দাঁড়াবে।

নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি 'লুটপাট নয়, উৎপাদন; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা' স্লোগান দিয়েছিল, কিন্তু সরকার গঠনের ছয় মাসের মধ্যেই তারা বিপরীত পথে হাঁটছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। জ্বালানি আমদানি ও বিদ্যুৎ বিতরণে বেসরকারীকরণের নামে অলিগার্কদের প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেন নাহিদ। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো জনস্বার্থে বাজার নিয়ন্ত্রণের বদলে নিয়ন্ত্রিত গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষক হয়ে উঠছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এলপিজি খাতের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, বেসরকারি আমদানিকারকদের হাতে বাজার ছেড়ে দেওয়ার পর সিলিন্ডারের দাম কী পরিণতি পেয়েছে তা প্রতিটি পরিবার টের পেয়েছে। এখন ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনেও একই পথে হাঁটার আয়োজন চলছে। ডিজেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; সেচ, কৃষি ও বাজারজাত পণ্যের দামেও তা প্রতিফলিত হবে।

জ্বালানি খাতকে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে চিহ্নিত করে নাহিদ বলেন, এখানে ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত দিতে হয় সাধারণ মানুষকে—কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও ছোট ব্যবসায়ীদের। তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপির হাতে রাষ্ট্র এখন জনগণের প্রতিনিধি নয়, গুটিকয়েক ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর ব্যবস্থাপকে পরিণত হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সমস্যার কার্যকর সমাধানের সক্ষমতা বিএনপির নেই; বরং তাদের নীতিই নতুন সমস্যার জন্ম দিচ্ছে।

বিবৃতিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ছয়টি বিষয় তুলে ধরেন নাহিদ ইসলাম। প্রথম বিষয় 'ইশতেহারের উল্টো পথে'—বিএনপির ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ খাতে দায়মুক্তিসহ কালাকানুন বাতিলের প্রতিশ্রুতি ছিল, কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষিত হয়নি। সম্প্রতি বসুন্ধরা অয়েল অ্যান্ড গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের বড় পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও নিজস্ব ব্যবস্থায় বাজারজাতের অনুমতির বিপক্ষে মত দেওয়ায় বিপিসির চেয়ারম্যানকে অন্যায়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

দ্বিতীয় বিষয় 'ইতিহাস ফিরে আসছে'—২০০১-০৬ মেয়াদের মতো আবারও বিএনপির সঙ্গে লোডশেডিং শব্দটি সমার্থক হয়ে উঠছে। উৎপাদন বৃদ্ধি না করে বিতরণ লাইন বাড়ানোর অসমন্বিত 'উন্নয়ন' দুই দশক পরেও অব্যাহত রয়েছে। তৃতীয় বিষয় 'টাকার অভাব'—সরকার দাবি করছে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের অর্থ নেই, কিন্তু নাহিদের মতে এটি অসত্য; প্রকৃত সমস্যা হলো সময়সূচিভিত্তিক ক্রয় পরিকল্পনার অভাব।

চতুর্থ বিষয় 'উৎপাদিত সংকট'—তিনি বলেন, একটি পরিকল্পিত ছক অনুযায়ী প্রথমে সরকারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না, এরপর সংকট তৈরি হলে বলা হচ্ছে সরকারি খাত অকার্যকর, অবশেষে বেসরকারি অলিগার্কদের হাতে লাইসেন্স তুলে দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিতরণেও একই কৌশল প্রয়োগের চেষ্টা চলছে—ভুতুড়ে বিল ও জালিয়াতির অভিযোগ এনে বেসরকারীকরণের যুক্তি তৈরি করা হচ্ছে, যার পেছনে একটিই উদ্দেশ্য: কমিশন ও রেন্ট সিকিং।

পঞ্চম বিষয়ে 'যুদ্ধের একমুখী অজুহাত টেকে না'—দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ লোডশেডিং চলছে; সরকার মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে দায়ী করলেও পিজিসিবির তথ্য বলছে, যুদ্ধ শুরুর আগেই সংকট তৈরি হয়ে গিয়েছিল। ষষ্ঠ বিষয় 'মহেশখালীর আগুন এবং জাতীয় সক্ষমতার প্রশ্ন'—২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুনে দৈনিক ৫১ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়; আংশিক সরবরাহ ফিরে আসে ১৫ দিন পর। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, রক্ষণাবেক্ষণের ত্রুটির স্বাধীন তদন্ত হয়েছে কি না এবং দেশের গ্যাসের এক-চতুর্থাংশের যোগানদানকারী টার্মিনালের পুনরুদ্ধারে ১৫ দিন লাগা একটি রাষ্ট্রের জন্য গ্রহণযোগ্য কি না।

বিবৃতিতে সরকারের জন্য ৩০ দিনের তাৎক্ষণিক পাঁচটি করণীয় প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়া স্থগিত করে উন্মুক্ত অংশীজন আলোচনা; আন্তর্জাতিক দরপত্রের সময়সীমা ১০ দিন থেকে ৪২ দিনে ফিরিয়ে আনা; বিপিসির সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর ক্রয় শিডিউল অনুমোদন ও ভবিষ্যতের ক্রয় ক্যালেন্ডার প্রকাশ; মহেশখালী টার্মিনাল দুর্ঘটনার স্বাধীন তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ এবং গ্যাস বরাদ্দে ডেটাভিত্তিক অগ্রাধিকার সূচক চালু।

মধ্যমেয়াদি (৬-১৮ মাস) করণীয় হিসেবে ছয়টি বিষয় উল্লেখ করেছেন—বিপিসির একচেটিয়া অধিকার ভেঙে প্রতিযোগিতামূলক উন্মুক্ত দরপত্র ও একাধিক অংশীদারিত্ব; পরিশোধিত তেলের বদলে অপরিশোধিত তেল আমদানির অনুমতি দিয়ে নিজস্ব রিফাইনারি স্থাপন ও ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ দ্রুত শেষ করা; ক্যাপাসিটি চার্জের পূর্ণ নিরীক্ষা করে উদ্বৃত্ত আদায়কারীদের পেমেন্ট বন্ধ; আইপিপি বকেয়া নিষ্পত্তিতে ধাপে ধাপে দায় নেওয়ার বিনিময়ে সিস্টেম লস কমানো ও আদায়-দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা; স্মার্ট মিটারিং বাধ্যতামূলক করা এবং এলপিজির দাম কমানো।

দীর্ঘমেয়াদি করণীয় চারটি বিষয়ের মধ্যে রয়েছে—তৃতীয় ও চতুর্থ এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনে দ্রুততা; সাগরে অনুসন্ধানে পিএসসি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করা; বাপেক্সে বিনিয়োগ ও বিদেশি অংশীদার আনা এবং সৌরবিদ্যুৎকে ব্যক্তি উদ্যোক্তানির্ভর করা, বাণিজ্যিক ও শিল্পভবনের ছাদে সোলার বাধ্যতামূলক করা ও ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ।