দেশের পাটশিল্পে ফের চাঙা ভাব ফিরেছে। টানা চার বছর পাট ও পাটপণ্যের রপ্তানি কমার পর ঘুরে দাঁড়িয়েছে এই খাত। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫–২৬ অর্থবছরে গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ রপ্তানি অর্জিত হয়েছে, যদিও করোনাকালের রেকর্ড ১.১৬ বিলিয়ন ডলার থেকে এখনও অনেক দূরে অবস্থান। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, এই অর্থবছরে পাট ও পাটপণ্যের রপ্তানি প্রায় ৮ শতাংশ বেড়ে ৮৮ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। গত অর্থবছর এই অঙ্ক ছিল ৮১ কোটি ডলারের কাছাকাছি।
শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, গত বছরের বন্যায় পাট উৎপাদন ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ফলে কাঁচা পাটের সরবরাহ কমে দাম বেড়ে যায়। প্রতি মণ কাঁচা পাটের দাম আগের বছরের ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকায় পৌঁছায়। বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তাপস প্রামাণিকের বক্তব্য, মূল্যবৃদ্ধির কারণে ১ হাজার ডলারের পণ্যের দাম বেড়ে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ ডলার হয়েছে। তাই অর্থের হিসাবে রপ্তানি বেড়েছে, যদিও পরিমাণের দিক থেকে কোনো অগ্রগতি নেই।
কাঁচা পাটের রপ্তানি এ বছর ১১ শতাংশ কমে ১৩ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা পরিমাণে ৭৭ শতাংশ হ্রাসের ইঙ্গিত দেয়। বিদায়ী অর্থবছরে মাত্র ৩৮ হাজার টন কাঁচা পাট বিদেশে গেছে, অথচ আগের অর্থবছর তা ছিল ১ লাখ ৬৭ হাজার টন। পাটের বস্তার রপ্তানি ৫ শতাংশ বেড়ে ১৩ কোটি ডলার হয়েছে, আর পাটের সুতা রপ্তানি ১৮ শতাংশ বেড়ে ৪৯ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। তবে মজার বিষয় হলো, পাটের সুতার পরিমাণ ২ শতাংশ কমে ৪ লাখ ২৮ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে, যা ইঙ্গিত করে দাম বাড়ার প্রভাব।
বহুমুখী পাটপণ্যের ক্ষেত্রে চিত্র ভিন্ন। এই খাতের রপ্তানি ১১ শতাংশ কমে ৭ কোটি ৪৪ লাখ ডলারে নেমে এসেছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, ইরান যুদ্ধের কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজার থেকে ক্রয়াদেশ ২০ থেকে ২৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাইরে অন্যান্য পণ্যের চাহিদা কমেছে। এছাড়া কাঁচা পাটের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ক্রয়াদেশ আরও কমিয়ে দিয়েছে।
পাটশিল্পের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বলেন, কাঁচামালের সরবরাহব্যবস্থা মসৃণ করা গেলে এবং নতুন বাজারে রপ্তানির জন্য প্রণোদনা বাড়ানো হলে পাটপণ্যের রপ্তানি অনায়াসে দুই থেকে তিন বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব। বহুমুখী পাটপণ্যের চাহিদা বিশ্বব্যাপী বাড়ছে—গৃহসজ্জা, শপিং ব্যাগ, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, অটোমোবাইল ও প্যাকেজিংয়ে পাটের ব্যবহার বাড়ছে। এছাড়া পাটকাঠির তৈরি চারকোলের চাহিদাও রয়েছে চীনসহ বিভিন্ন দেশে।
বহুমুখী পাটপণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ক্রিয়েশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রাশেদুল করিম মনে করেন, পাটের সুতা ও বস্তায় মুনাফার মার্জিন খুবই কম। ফলে কাঁচা পাটের দাম বাড়লে ব্যবসায়ীরা মুনাফা ধরে রাখতে হিমশিম খান। তিনি বলেন, ‘পাট খাতের রপ্তানি বাড়াতে হলে বহুমুখী পণ্য উৎপাদন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। চীন ও ভারতের মতো দেশ এগিয়ে গেছে। তাই নতুন পণ্য উন্নয়নে গবেষণা ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।’ বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাটপণ্যের রপ্তানি ৫০০ কোটি ডলারে উন্নীত করা সম্ভব। তবে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো উদ্যোগ এখনো দেখা যায়নি।


