২০২০ সালের অক্টোবর মাসের শেষ দিকে বেগার্ট ইনস্টিটিউটে এক আড্ডায় ইমতিয়াজ আলম বেগের কাছ থেকে ফুটে ওঠে একটি কালো মলাটের বই—ফটোগ্রাফি ডাইজেস্ট। ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি (বিপিএস) থেকে প্রকাশিত এই দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থটির রচয়িতা ছিলেন মনজুর আলম বেগ। এর প্রচ্ছদে ছিল একটি সাদাকালো ছবি, যেটিও তাঁরই তোলা। ছবিতে দেখা যায় নগরের পিচঢালা রাস্তায় সিমেন্টের মোটা পাইপ সারিবদ্ধভাবে রাখা। তপ্ত দুপুরে সেই পাইপের ভেতরে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে দুই শ্রমজীবী মানুষ। তাদের পাশ দিয়ে ধীরগতিতে চলছে একটি নির্মাণসামগ্রীর ট্রাক। প্রাত্যহিক নগরজীবনের এই দৃশ্যে এক ভিন্ন অনুভূতি তৈরি হয়। কঠিন জড়বস্তুর মাঝে যেন প্রাণের সঞ্চার ঘটেছে। পাইপগুলোর ফাঁকা জায়গা দিয়ে আলো প্রবেশ করে হালকা ছায়ায় বক্রাকার রেখা সৃষ্টি করেছে, যা অনেকটা গোলাপের পাপড়ির চক্রাকার বিন্যাসের মতো মনে হয়। এই ছবির সঙ্গে প্রস্ফুটিত গোলাপের তুলনা টানা যায়।
ছবিটি স্ট্রিট ফটোগ্রাফির এক অসাধারণ উদাহরণ, যা ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফির গুরুত্বপূর্ণ ধারা। ঠিক কখন ও কোথায় এটি তোলা হয়েছে তা জানা না গেলেও, ছবির উপাদান বিশ্লেষণ করে বোঝা যায় সম্ভবত স্বাধীনতার পরপর ঢাকায় এটি ধারণ করা হয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের রাজধানী তখন ফাঁকা, রাস্তায় মানুষের আনাগোনা কম। পয়োনিষ্কাশনের পাইপ আর দূরে ঊর্ধ্বমুখী দালানকোঠা নতুন রাষ্ট্রের অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে ধরা দেয়। বোঝা যায় যুদ্ধের ধকল কাটিয়ে রাজধানীর পরিধি বিস্তৃত হচ্ছে। পাঁচ দশক আগের এই শহরের চিত্র ফুটে ওঠে এই ছবিতে, যা এক ঐতিহাসিক গুরুত্বও বহন করে।
দেখার চোখ না থাকলে আলোকচিত্রশিল্পী নিশ্চয়ই সেটিকে ছবি করে তুলতে পারতেন না—এখানেই শিল্পীর মাহাত্ম্য। মিডিয়াম ফরম্যাট ক্যামেরায় তোলা এই ছবি নিয়ে কথা বলেন প্রকৃতিবিষয়ক লেখক মৃত্যুঞ্জয় রায়। তিনি ছবিটি দেখে মন্তব্য করেন, পয়োনিষ্কাশন পাইপগুলোর বৃত্তাকার মুখগুলো সৃষ্টি করেছে এমন এক আর্ট, যাকে আধফোটা গোলাপের মুখের সঙ্গে তুলনা করা যায়। গোলাপের পাপড়ির মতো সর্পিলাকারে সজ্জিত পাইপের মুখগুলো এবং তাদের ঘন কেন্দ্র যেন শিল্পীর চোখের প্রতিফলন।
আলোকচিত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘কাউন্টার ফটো’র প্রতিষ্ঠাতা সাইফুল অমি এই ছবির একাডেমিক মূল্যায়নে পাঁচ দিন সময় নিয়ে লিখেছেন, স্ট্রিট ফটোগ্রাফির প্রধান বৈশিষ্ট্য কম্পোজিশনের চমক আর মুহূর্ত ধরতে পারার ক্ষমতা। বেগ স্যারের এই বিশেষ ছবি প্রথম দেখে তিনি থমকে যান। স্ট্রিট ফটোগ্রাফির সব প্রথা ভাঙা এই ছবিতে একটার পর একটা তলা রয়েছে। রাস্তায় পড়ে থাকা মানুষ, অন্তহীন যাতনার অতল জীবন—যার চক্কর থেকে বের হওয়ার ক্ষমতা নেই। আলোর খেলা, বাঁয়ে চলমান গাড়ি যা জীবনের সিম্বল। দম বন্ধকরা পাইপের ভেতর আটকে যাওয়া জীবন—এভাবেই বেগ স্যার দারিদ্র্য ও বেঁচে থাকার গল্প বলেন।
সাইফুল অমি আক্ষেপ করে আরও বলেন, আলোকচিত্রের শিক্ষক হিসেবে প্রশ্ন তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়—বেগ স্যারের আরও অনেক কাজ যদি জনসমক্ষে আসত, তাহলে বাংলাদেশের আলোকচিত্রের গতিপথ কেমন হতো? কয়েক বছর আগে ধানমন্ডিতে ‘উত্তরসূরি’ আয়োজিত একটি প্রদর্শনীর কথা মনে পড়ে, যেখানে তাঁর ছবি দেখে বারবার ভেবেছেন আমাদের সব থেকে ক্ষমতাবান আলোকচিত্রীর কতটুকু আমরা সামনে আনতে পারলাম। বাংলাদেশের দৃশ্যশিল্পের নক্ষত্রদের একজন আলোকচিত্রাচার্য মনজুর আলম বেগ। চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদিনের সমতুল্য তিনি। জয়নুলের মতো তিনিও একনাগাড়ে শিল্পী, শিক্ষক ও সংগঠকের ভূমিকায় আলোকচিত্রের বিবর্তনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন, বদলে দিয়েছেন ছবি তোলা চর্চার প্রথাগত ধারণা। তিনি জীবনভর ছবি তুলেছেন, লিখেছেন, অন্যকে লিখতে উৎসাহিত করেছেন; একটি শিল্পপ্রজন্ম গড়ে তুলতে তিনি কী না করেছেন! অথচ এমন এক নক্ষত্রমানবের বেশির ভাগ ছবি যে প্রজন্মের অদেখা রয়ে গেল—সেটি আলোকচিত্রশিল্প মাধ্যমের জন্য এক বড় দুর্ভাগ্য।




