পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। দেশটির সুপ্রিম কোর্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানকে দুই দিনের মধ্যে আদিয়ালা কারাগার থেকে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। গত মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) এ সংক্রান্ত আদেশ দেওয়া হলে দেশটির আইন ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। প্রায় তিন বছর ধরে রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকা ইমরান খানের জন্য এটি কি নতুন রাজনৈতিক পরিসর তৈরি করবে, তা নিয়ে নানামুখী আলোচনা শুরু হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই আদেশকে ইমরান খানের সঙ্গে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর কোনো গোপন সমঝোতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যেতে পারে। তাঁদের যুক্তি, রাজনৈতিক ও বিচারিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এমন নির্দেশ অন্যথায় ব্যাখ্যা করা কঠিন। এমনকি ইমরান খান নতুন প্রদেশ গঠন বা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য জাতীয় সরকার গঠনের মতো প্রস্তাবেও সম্মত হতে পারেন বলে জল্পনা ছড়িয়েছে।
ক্ষমতাসীন পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) এই আদেশে কিছুটা বিভ্রান্ত বলে মনে হচ্ছে। দলটির জ্যেষ্ঠ নেতারা আদেশটির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও সিনেটর নাসির বাট এই ঘটনাকে নওয়াজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি মনে করছেন, শেষ পর্যন্ত ইমরান খানকে হাসপাতাল থেকে সরাসরি তাঁর বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হতে পারে। অন্যদিকে, আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারার ঘোষণা দিয়েছেন, ফেডারেল সরকার এই আদেশের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করবে। বেসরকারি হাসপাতালে ইমরানকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। এক জ্যেষ্ঠ আইন কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলেছেন, সরকার কি প্রতিটি বন্দীকে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার সুযোগ দিতে বাধ্য? যে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই আদেশ দেওয়া হয়েছে, তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও তিনি গুরুতর আপত্তি জানিয়েছেন।
তবে, জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের একাংশের মতে, ২৭তম সংবিধান সংশোধনের পর ইমরান খানের বিষয়ে উচ্চ আদালতের দেওয়া বিচারিক আদেশ বাস্তবায়নে উচ্চতর বিচার বিভাগের ক্ষমতা অনেকটাই সীমিত হয়ে গেছে। পিএমএল-এনের কয়েকজন নেতা মনে করছেন, আদেশটি তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়িত হলে অনেকে এটিকে ‘কিছু মহলের’ সম্মতিতে নেওয়া সিদ্ধান্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারেন। তাঁদের মতে, পিটিআইয়ের সঙ্গে যেকোনো সমঝোতার চূড়ান্ত পরিণতি নির্ভর করবে ইমরান খানের ভবিষ্যৎ কার্যকলাপের ওপর।
সাবেক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল তারিক মাহমুদ খোখর এই বিচারিক নির্দেশনাকে ‘দেশ ও প্রবাসী জনগণের সম্মিলিত স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার মুহূর্ত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, এটি ‘শরিফ ও জারদারি পরিবারের জন্য ভালো কোনো ইঙ্গিত নয়’ এবং প্রমাণ করে ‘অসাংবিধানিক শক্তি, পিএমএল-এন ও পিপিপির অশুভ ত্রিশক্তির মধ্যে সবকিছু ঠিকঠাক নেই’। খোখর বলেন, এই ঘটনার পেছনে হয়তো দেরিতে হলেও এই উপলব্ধি কাজ করেছে যে ‘ফরম ৪৭-এর সমাধান আসলে কোনো সমাধান নয়’। উল্লেখ্য, ‘ফরম ৪৭’ ২০২৪ সালের নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগের সঙ্গে জড়িত একটি রাজনৈতিক পরিভাষা। তাঁর মতে, এটি পাকিস্তানকে অস্তিত্বের সংকট থেকে বের করে আনতে পারেনি এবং এর মাধ্যমে নতুন প্রদেশ গঠনের সম্ভাবনাও নেই। খোখর মনে করেন, অবহিত পর্যবেক্ষকেরা পাকিস্তানের বিচারব্যবস্থাকে ‘রাজনৈতিক, প্রেটোরিয়ান এবং অসাংবিধানিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল’ বলে মনে করেন। তাঁদের সম্মতি ছাড়া এ ধরনের আদেশ দেওয়া হয়েছে—এটা কল্পনা করাও কঠিন বলে মন্তব্য করেন তিনি। খোখরের ভাষ্যমতে, এই বিচারিক আদেশের মাধ্যমে ইমরান খানকে হাসপাতালে নেওয়াকে তাঁরা ‘বৈধতার আবরণ’ হিসেবে দেখছেন। তিনি আরও বলেন, ‘যা-ই হোক না কেন, পাকিস্তানজুড়ে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে। এই পরিবর্তনের গতি ইমরান খান ও দেশের পক্ষে যাচ্ছে। বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে শরিফ ও জারদারি পরিবারের ক্ষেত্রে।’ তাঁদের ‘ক্ষমতায়ন শুরু থেকেই ব্যর্থ হওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল’ বলেও মন্তব্য করেন খোখর। এখন তাঁরা ‘রাজনৈতিক, নৈতিক, সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক—সব দিক থেকে পুরোপুরি ধরা খেয়েছেন ও গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছেন’। একটি পরিবর্তন শুরু হয়েছে, যার পরিণতিতে পিটিআইকে অন্তর্ভুক্ত করে জাতীয় সরকার গঠিত হতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।
সাবেক ফেডারেল মন্ত্রী ও পিটিআই নেতা ফাওয়াদ চৌধুরী সুপ্রিম কোর্টের এই আদেশকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এটি ‘সুস্থ রাজনৈতিক অগ্রগতির নতুন এক যুগের’ সূচনা করতে পারে এবং সরকার ও পিটিআইয়ের মধ্যে আলোচনা সঠিক পথে এগোচ্ছে বলে ইঙ্গিত দেয়। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, এই প্রক্রিয়ায় স্টাবিলিশমেন্টের (সেনাবাহিনীর) সম্মতি থাকবে এবং এর সমাপ্তি পাকিস্তানের জন্য কল্যাণকর হবে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক পরিসর দেওয়া এবং নতুন প্রদেশ গঠনের মতো জটিল বিষয়ে সংলাপের পরিবেশ তৈরির গুরুত্বও তুলে ধরেন তিনি। ফাওয়াদ চৌধুরীর মতে, এ ধরনের সংলাপে ইমরান খানের সমর্থন অপরিহার্য।
সাবেক আইন কর্মকর্তা ওয়াকার রানা এই আদেশকে ‘খুবই ইতিবাচক অগ্রগতি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, আদালত মূলত সংবিধান ও নাগরিকদের সেই অধিকার সমুন্নত রেখেছেন, যা সাম্প্রতিক সময়ে যথাযথভাবে রক্ষা করা হয়নি। পাকিস্তানকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট থেকে বের করে আনতে অর্থবহ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি তৈরি হয়েছে বলেও তিনি মনে করেন। বর্জনের রাজনীতির অবসান ঘটানোর সময় এসেছে উল্লেখ করে রানা বলেন, দেশের স্বার্থে এমন অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি দরকার, যেখানে সব শক্তি একযোগে কাজ করবে। তিনি তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার কয়েকটি দেশের অভিজ্ঞতা থেকে পাকিস্তানের শিক্ষা নেওয়া উচিত বলে মত দেন, যারা তাদের রাজনৈতিক গতিপথ পরিবর্তন করেছে। ইমরান খান তাঁর জীবন ও রাজনীতি নিয়ে ভাবার যথেষ্ট সময় পেয়েছেন এবং কিছু শিক্ষা নিয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। পাশাপাশি বিচার বিভাগ সংস্কারের আহ্বান জানান তিনি।
তবে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সুপ্রিম কোর্টের এই আদেশের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, ইমরান খানের স্বাস্থ্য নিয়ে কারা কর্তৃপক্ষের দেওয়া প্রতিবেদনটি ‘বিচারব্যবস্থার, বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্ট ও ফেডারেল সাংবিধানিক আদালতের বিরুদ্ধে এক ধরনের অভিযোগপত্র’। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, অতিরিক্ত দেরির কারণে যদি তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে, তাহলে এর দায় কার? আদেশটির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, এর মাধ্যমে একজন রাজনৈতিক নেতার রাজনৈতিক বক্তব্যের ওপর সাংবিধানিক বিধিনিষেধ আরোপের চেষ্টা করা হয়েছে। ইমরান খানের পরিবারের সদস্যদের হলফনামা দিতে বলা হয়েছে শোনা যাচ্ছে, যা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, তাঁরা যদি হলফনামা দিতে অস্বীকৃতি জানান, তাহলে কী হবে? শুধু নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে কি সুপ্রিম কোর্ট একজন বন্দীর স্বাস্থ্যের আরও অবনতি হতে দেবে? নাকি রাজনৈতিক বিবেচনাকে সাংবিধানিক দায়িত্বের ওপর প্রাধান্য দেওয়া হবে? তিনি আরও বলেন, যেসব বিচারক এই আদেশ দিয়েছেন, তাঁরা সংবিধান সংরক্ষণের শপথ নিয়েছেন। এই শপথের সঙ্গে বিরাট দায়িত্বও রয়েছে। সবকিছু যদি কোনো রাজনৈতিক সমঝোতার অংশ হয়, তাহলে প্রশ্ন আরও গভীর হয় এবং প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে আর কী অবশিষ্ট থাকে? ইতিহাস তাঁদেরই মনে রাখে, যাঁরা নীতির সঙ্গে আপস না করে কারাবরণ করেছেন। খান আবদুল গফফার খান কয়েক দশক কারাগারে ছিলেন, নেলসন ম্যান্ডেলা ২৭ বছর। তাঁদের সংগ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোনো আদর্শের শক্তি কারাবাসের মেয়াদ দিয়ে নির্ধারিত হয় না, বরং মৌলিক নীতির কাছে আত্মসমর্পণ না করার মধ্যেই সেই শক্তি নিহিত।




