২০১২ সালের ১৯ জুলাই প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের নাটক ও চলচ্চিত্র আজও দর্শকের মনে গভীর স্থান করে রেখেছে। তার রচিত 'কোথাও কেউ নেই' নাটকের 'বাকের ভাই' চরিত্রটি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, নাটকে তার ফাঁসি না দেওয়ার দাবিতে রাস্তায় নেমেছিলেন দর্শকরা। দেয়ালে দেয়ালে স্লোগান ও পোস্টার দেখা গিয়েছিল, যেখানে লেখা ছিল 'বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হলে জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে'।
এই নির্মাতার কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো গল্পের সহজ, সরল ও জীবনঘনিষ্ঠ বুনন। তাঁর 'বহুব্রীহি' নাটকে একটি শিশুর বাবার কাছে মায়ের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন আমাদের মনকে স্পর্শ করে। 'আমার আছে জল' সিনেমার বৃষ্টির দৃশ্যে গান আমাদের মুগ্ধ করে। তিনি চরিত্র সৃষ্টিতেও ছিলেন অনন্য। হিমু, মিসির আলী, বাকের ভাই, শুভ্র—প্রত্যেক চরিত্রই স্বতন্ত্র। 'হাবলংগের বাজারে' ও 'গৃহসুখ প্রাইভেট লিমিটেড'-এর মতো নাটকের কমেডি দর্শককে হাসায়।
সংলাপের ক্ষেত্রে তাঁর সহজবোধ্যতা দর্শককে আকর্ষণ করে। 'কোথাও কেউ নেই'-এর বাকের ভাই ও মুনার সংলাপে প্রতিদিনের ভাষা ব্যবহার করেছেন। মুনার 'ভুল মানুষকে ভালোবাসা'র বক্তব্য দর্শকের নিজের অনুভূতির মতো লাগে। গ্রামীণ জীবন, লোকসংস্কৃতি ও বর্ষা-বিয়ের মতো অনুষ্ঠানের নান্দনিক উপস্থাপন তাঁর কাজে দেখা যায়। 'ঘেটু পুত্র কমলা' ও 'শ্রাবণ মেঘের দিন' সিনেমায় ঐতিহ্যের ছোঁয়া স্পষ্ট।
গানের ব্যবহারেও তিনি সচেতন ছিলেন। 'যদি মন কাঁদে', 'একটা ছিল সোনার কন্যা', 'আমার আছে জল'—এসব গান আজও শ্রোতাপ্রিয়। তাঁর অধিকাংশ নাটক-সিনেমায় ট্র্যাজেডি ও কমেডির মিশ্রণ দেখা যায়, যা দর্শকের হৃদয়কে পূর্ণ করে। জীবনের টানাপোড়েন—প্রেম, বিরহ, একাকিত্ব, অভাব—এসব বিষয় তিনি সফলভাবে চিত্রায়িত করেছেন। 'নক্ষত্রের রাত' নাটকে আসাদুজ্জামান নূরের 'একা থাকার উপায় হলো অনেক মানুষের সঙ্গে থাকা' সংলাপটি দর্শককে ভাবায়।
হুমায়ূন আহমেদের জন্য নিজের উপন্যাস অবলম্বনে নাটক বা সিনেমা তৈরি করা চ্যালেঞ্জিং ছিল, কারণ পাঠকের মনে ইতিমধ্যে একটি ছবি তৈরি হয়ে যায়। কিন্তু তিনি পাঠকের মন ও দর্শকের মন—দুটোই বুঝতে পেরেছিলেন। তাঁর চিত্রনাট্যে সহজাত অভিনয় ও অভিনবত্ব বিদ্যমান, যা দর্শকের চোখে বাস্তব হয়ে ওঠে। কিংবদন্তি অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সাহচর্যে তাঁর গল্পগুলো প্রাণবন্ত হয়েছে। এ কারণেই 'উড়ে যায় বকপক্ষী', 'আগুনের পরশমণি', 'চন্দ্রকথা'-র মতো কাজ আজও দর্শককে মুগ্ধ করে।


