বাংলাদেশের আলোচিত নির্মাতা রায়হান রাফীর পথচলা শুরু হয়েছিল মায়ের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে। ক্লাস নাইনে পড়ার সময় শর্টফিল্ম তৈরির ইচ্ছা থেকে তিনি মায়ের সোনার চেইন বিক্রি করে ১২ হাজার টাকা জোগাড় করেন। সেই অর্থে বানান প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য ‘আজব বাক্স’। মায়ের আশীর্বাদ ও এই সাহসিকতা তাকে ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে যায় চলচ্চিত্র জগতে।
বর্তমানে রাফীর নাম বাংলাদেশি সিনেমার অন্যতম সফল পরিচালক হিসেবে গণ্য। তার তৃতীয় সিনেমা ‘পরাণ’ তাকে খ্যাতির উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। শরীফুল রাজ ও বিদ্যা সিনহা মিম অভিনীত এই ছবি দিয়ে তিনি নিজের আগের কাজকেও ছাড়িয়ে যান। এরপর ‘সুড়ঙ্গ’ সিনেমায় আফরান নিশো ও তমা মির্জাকে নিয়ে আরও এক ধাপ এগিয়ে যান। তবে সবচেয়ে আলোচিত তার সাম্প্রতিক সিনেমা ‘তুফান’। শাকিব খান অভিনীত এই ছবি মুক্তির পর সিনেমা হলে টিকিটের জন্য ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে, যা বহুদিন পর দেখা গেল। শুধু বড় পর্দা নয়, ওটিটিতেও ‘মায়া’ ওয়েব ফিল্ম দিয়ে নিজের দক্ষতা দেখিয়েছেন তিনি।
রাফীর সাফল্যের মূল রহস্য কী? বিশ্লেষকরা বলেন, তার নির্মাণশৈলী ও গল্প বলার ঢং দর্শকদের মন কেড়েছে। তিনি পরিচিত ঘটনাকে নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করতে পারেন। ‘পরাণ’-এ ত্রিকোণ প্রেম, ‘মায়া’য় নারীর জীবনসংগ্রাম—এসব চিরাচরিত বিষয়কে তিনি পর্দায় ফুটিয়ে তোলেন বাস্তবিক দক্ষতায়। চরিত্রায়নেও তিনি ভিন্নতা আনেন। ‘সুড়ঙ্গ’-এ নিশোকে ভিন্ন লুকে উপস্থাপন, ‘তুফান’-এ শাকিব খানের দ্বৈত চরিত্র তুফান ও শান্ত—প্রতিটি চরিত্রকে তিনি আলাদা বৈশিষ্ট্যে সাজান। পুলিশ অফিসারের মতো গতানুগতিক চরিত্রকেও তিনি আধুনিকায়ন করেন।
গানের প্রতিও এই নির্মাতার বিশেষ মনোযোগ লক্ষণীয়। ‘তুফান’-এর ‘লাগে উড়াধুড়া’ গানটি সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে। একটি গান তৈরিতেই তিনি চার মাস সময় নিয়েছেন বলে জানান। তার মতে, তিনি এমন একটি দেশীয় গান তৈরি করতে চেয়েছিলেন যা সব বয়সী দর্শকের মাঝে ছড়িয়ে পড়বে। ‘সুড়ঙ্গ’-এর ‘গাঁ ছুয়ে বলো’ ও ‘পরাণ’-এর ‘চলো নিরালায়’ গানও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। প্রচারণা ক্ষেত্রেও নতুনত্ব এনেছেন রাফী। তিনি শুধু প্রচারণার জন্য আলাদা একটি গান তৈরি করেছিলেন, যা ‘দামাল’ সিনেমায় স্থান পায়নি।
অভিনেতা-অভিনেত্রীদের থেকে সেরা পারফরম্যান্স বের করে নিতেও তিনি সিদ্ধহস্ত। ‘টান’-এ শবনম বুবলী এবং ‘মায়া’য় ইমন তার পরিচালনায় দিয়েছেন ক্যারিয়ারের সেরা অভিনয়। শাকিব খানকেও ‘তুফান’-এ নতুনভাবে আবিষ্কার করেছেন দর্শকরা। তার সিনেমার সংলাপ, আবহসংগীত ও সিনেমাটোগ্রাফি সবই প্রশংসিত। সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আলোচনায় রাফী বলেন, সিনেমা এমন একটি শিল্প যার মাধ্যমে প্রতিবাদ ও সমাজব্যবস্থা তুলে ধরা যায়। তিনি জানিয়েছেন, ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে তার।
সবমিলিয়ে, মায়ের সোনার চেইন বিক্রি করে চলচ্চিত্র জগতে পা রাখা রায়হান রাফী এখন বাংলাদেশি সিনেমার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার নির্মাণশৈলী, গল্প বলার পারদর্শিতা ও চরিত্রসৃষ্টির নৈপুণ্য তাকে দিয়েছে ব্যতিক্রমী অবস্থান।


