মিনিটে মিনিটে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার অভ্যাস বোরহানের। বেশি স্ট্যাটাস দিলে রিচ ভালো হয় না—এই বিষয়ে সে ওয়াকিবহাল। তবুও জেনে-শুনে এই পথেই হাঁটতে তার ভালো লাগে। আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে স্মার্টফোনে নোটিফিকেশন দেখে সে হতাশ; গত রাতে দেওয়া স্ট্যাটাসে তেমন লাইক-কমেন্ট পড়েনি। ক্ষুব্ধ হয়ে সে সাথে সাথে লিখে বসল, ‘ভাল্লাগে না কিচ্ছু’। অবাক করা বিষয়, মাত্র দেড় মিনিটের মধ্যেই এই স্ট্যাটাসে প্রথম লাভ রিঅ্যাক্ট পড়ল। কারও কাছে কিছু না ভালো লাগা যে অন্যের ভালো লাগার কারণ হতে পারে—এই ভাবনায় সে পুলকিত হলো। এরপর ফেসবুক বন্ধু মজিদ কমেন্ট করে বলল, ‘এইবার ভালা লাগানির ট্যাবলেট আবিষ্কার কইরা ফালান! নিজে বাঁচেন, লাখো রোগীরেও বাঁচান!’ নানা নেতিবাচক মন্তব্য দেখে চতুর্থ স্ট্যাটাসে বোরহান লিখল, ‘ইদানীং সবকিছুতে আমার এত আনন্দ কেন হয়? তবে কি সুখী মানুষের কাতারে উঠে পড়লাম!’ এবার স্যাড-হাহা রিঅ্যাক্টের পাশাপাশি কমেন্টের ঢল নামল। পাড়াত বন্ধু মিনহাজ তাকে ২০ টাকা ধার দেওয়ার কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলে, তার মতো সুখী মানুষ আর নেই। ‘অচেনা একজন’ আইডি থেকে মন্তব্য এল, ‘জি ভাই। আপনাদেরই সুখের দিন। আমরা কলুর বলদ হয়ে খেটেই মরলাম।’ সুখী আক্তার ইনবক্সে উল্টাপাল্টা কিছু লিখলে ব্লক করার হুমকি দিল। ফেসবুক কবি বিসর্গ তোতন মন্তব্য করলেন, ‘মনপ্রাণ লাগিয়ে স্ট্যাটাসগুলো পড়লাম। ভালো কোনো মনীষী বর্তমানে থাকলে বলতেন, “আইডি খুলেছিস যখন, বিনোদন দিয়ে যা!”’ বোরহান জানে, এই কবি সম্প্রতি ষাটের দশকের এক প্রবীণ কবিকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে আনন্দ মিছিল করেছিলেন। পরে কবিকে ট্যাগ করেও কোনো সাড়া না পেয়ে দ্বিতীয়বার নিরানন্দ মিছিল করেছেন, আহ্বান ছিল অকৃতজ্ঞ কবিকে বয়কটের। বিভিন্ন সময়ে বাজে মন্তব্যের প্রতিবাদেও তিনি এমন নিরানন্দ মিছিল করে থাকেন। এক ঘণ্টা পর বোরহান উপলব্ধি করল, ফেসবুকবাসী ভালো বা খারাপ কোনো খবরই সোজাভাবে নিতে পারে না; তাদের সহজাত প্রবৃত্তি বক্রোক্তি করা। তাই নিজের সুখের বানোয়াট গল্প শোনানোই মঙ্গল, তাতে প্রচুর লাইক-কমেন্ট পাওয়া যায়। এই ভেবে সে আরেকটি স্ট্যাটাস দিল, ‘ভেবে দেখলাম, রেডি ফ্ল্যাট কেনার চেয়ে জায়গা কিনে নিজেদের হাতেই বাড়ি বানানো ভালো। তাতে পছন্দসই বাড়ি মেলে, বাড়ির ওপর মায়া-মমতাও বৃদ্ধি পায়। যাই, বসুমতী অনাবাসিক এলাকায় জায়গার বায়নাপত্রটা করেই ফেলি।’ এই স্ট্যাটাসে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পড়ল। একজন হা হা রিঅ্যাক্ট দিয়ে লিখল, ‘এত দিন জানতাম তোমার চাকরি নেই। এখন দেখছি বসুমতী অনাবাসিক এলাকার মতো সম্ভ্রান্ত জায়গায় বাড়ি করার মতো সামর্থ্যও আছে! এটাকেই তোমরা ক্রমান্বয়ে আবাসিক এলাকা করে তুলবে। খুব ভালো!’ পাল্টা জবাব দেওয়ার আগেই ফোন বেজে উঠল। বোরহানের মেজ খালা মধু গলায় খোঁজখবর নিতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি জানালেন, খালু ভীষণ অসুস্থ, হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে এবং ৫০ হাজার টাকা ধার চাইছেন। বোরহান চাকরি না থাকার কথা বলে অক্ষমতা প্রকাশ করলে খালা জানালেন, তার বোন মনীষা তো বলেছে সে জমি কিনতে যাচ্ছে। বোরহান বুঝিয়ে বলল, ‘ওসব ফেসবুক স্ট্যাটাস, খালা। মানে নিজের স্ট্যাটাস বাড়ানোর জন্যই এসব লেখা হয়! মনীষা নিজেও তো বানিয়ে বানিয়ে কত কিছু লেখে! এসব বলে না তোমাদের?’ উত্তরে খালা ‘দড়াম’ করে ফোন কেটে দিলেন। বোরহানের মনে হলো তার কানে তালা লেগে গেল! তবে এই তালা খোলার চাবিও আছে—আরেকটা চটকদার স্ট্যাটাস!
ফেসবুকের কৃত্রিম জগৎ: স্ট্যাটাস, প্রতিক্রিয়া আর এক বাস্তব তালা
বোরহান ফেসবুকে নানা ধরনের স্ট্যাটাস দিয়ে ভুয়া জীবনযাপনের চেষ্টা করে, যেখানে ভালো-খারাপ সব প্রতিক্রিয়াই আসে বক্রোক্তি হিসেবে। জমি কেনার ভুয়া স্ট্যাটাস দেওয়ার পর তার খালা টাকা চাইলে সত্যি প্রকাশ পায়, আর ফোন কেটে দিলে সে আবার নতুন স্ট্যাটাস দেওয়ার পরিকল্পনা করে।




