প্রোটিনকে এতদিন পেশি গঠন ও সুস্থ শরীরের অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ফিটনেস সচেতন মানুষের কাছে প্রোটিন বার, শেক কিংবা প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার যেন জাদুকরী। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, দৈনন্দিন খাবারে প্রোটিনের পরিমাণ কমানো হলে বয়স বৃদ্ধির প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায় এবং আয়ু বেড়ে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন-ম্যাডিসন ইউনিভার্সিটির গবেষক ডাডলি ল্যামিংয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় ইঁদুরের ওপর প্রায় ৩০০টি ভিন্ন গবেষণাপত্র বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, যেসব ইঁদুরকে শরীরের জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় প্রোটিন দেওয়া হয়েছিল, তারা অতিরিক্ত প্রোটিন খাওয়া ইঁদুরের চেয়ে প্রায় ১২০ দিন বেশি বেঁচে ছিল। ইঁদুরের সাধারণ আয়ুর হিসেবে এই সময়কাল তাদের জীবনের ৫০ শতাংশেরও বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য নির্দেশিকা অনুযায়ী, একজন মানুষের জন্য প্রতি কেজি ওজনে গড়ে ০.৮ গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রোটিন কম খেলে শরীরে FGF21 নামের একটি হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। এই হরমোন মস্তিষ্ক, চর্বি ও লিভারে কাজ করে রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং বার্ধক্যজনিত অকেজো কোষ কমিয়ে দেয়। এছাড়াও, প্রোটিন কম খেলে mTORC1 নামক একটি প্রোটিনের কার্যকারিতা হ্রাস পায়, যা কোষের সংখ্যা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এই প্রোটিনের কার্যকারিতা কমে গেলে কোষগুলো বিভাজনের পরিবর্তে নিজেদের মেরামতের দিকে মনোযোগ দেয়, ফলে বয়সজনিত রোগের ঝুঁকি কমে যায়।
তবে এই গবেষণার ফলাফল নিয়ে সবাই একমত নন। ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় আরবানা-শ্যাম্পেইনের গবেষক ডোনাল্ড লেম্যান মনে করিয়ে দিয়েছেন, মানুষ আর ইঁদুরের বিপাক প্রক্রিয়া এক নয়। মানুষ দিনে কয়েকবার বড় খাবার খায়, কিন্তু ইঁদুর সারাদিন ছোট ছোট খাবার খায়। mTORC1 প্রোটিন খাবার খাওয়ার মাধ্যমে সক্রিয় হয়, তাই খাদ্যাভ্যাসের পার্থক্যের কারণে প্রভাব ভিন্ন হতে পারে। তাছাড়া, মানুষের জীবনে সংক্রমণ বা প্রতিকূল পরিবেশের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়, যা বয়স বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে। লেম্যান আরও উল্লেখ করেছেন যে, বয়স্কদের ক্ষেত্রে বেশি প্রোটিন খাওয়া পেশির দুর্বলতা কমাতে সাহায্য করে।
ল্যামিংয়ের জবাবে জানান, তারা কোনো গবেষণাপত্র ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেননি, বরং প্রোটিন কমানোর প্রভাব নিয়েই মূলত কাজ করেছেন। এদিকে, যুক্তরাজ্যে বয়স্ক যমজদের ওপর করা গবেষণায় দেখা গেছে, বেশি প্রোটিন পেশি ক্ষয় কমায়। তবে শেফিল্ড ইউনিভার্সিটির গবেষক এলিজাবেথ উইলিয়ামস মনে করেন, সেই গবেষণায় পেশি ক্ষয়ের হার খুবই কম ছিল, তাই সিদ্ধান্তটি পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয়।
নটিংহ্যাম ইউনিভার্সিটির গবেষক ফিলিপ আথারটন বিতর্কের মাঝে একটি আশার কথা শুনিয়েছেন। মাংস, মাছ বা দুগ্ধজাত খাবারে থাকা আইসোলিউসিন এবং ভ্যালিনের মতো নির্দিষ্ট অ্যামিনো অ্যাসিড কমিয়ে দিলে পুরো প্রোটিন না কমিয়েও আয়ু বাড়তে পারে। ইঁদুরের ওপর করা পরীক্ষায় এই ফল পাওয়া গেছে। আথারটন শিগগিরই মানুষের ওপর এই গবেষণা শুরু করতে যাচ্ছেন, যেখানে দেখা হবে নির্দিষ্ট অ্যামিনো অ্যাসিড কমানোর প্রভাব। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে হয়তো আমরা জানতে পারব, দীর্ঘায়ুর রহস্য আসলেই প্রোটিনের প্লেটে লুকিয়ে আছে কিনা।




