আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে (আইএমও) ২০২৪ সালে এক নতুন প্রতিযোগীর আগমন ঘটেছিল, যার কোনো ভৌত অস্তিত্ব নেই। গুগল ডিপমাইন্ডের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সিস্টেম আলফাপ্রুফ ও আলফাজ্যামিতি ২। ওই বছর প্রতিযোগিতার ছয়টি প্রশ্নের মধ্যে চারটির সঠিক সমাধান দিতে সক্ষম হয় সিস্টেম দুটি, যা ৪২-এ ২৮ নম্বরের সমতুল্য। এই নম্বর রৌপ্যপদক অর্জনের নিম্নসীমা ২২-কে ছাড়িয়ে যাওয়ায়, এআই কার্যত একটি রৌপ্যপদকের সম্মান অর্জন করেছিল। স্বর্ণপদকের জন্যে প্রয়োজনীয় ২৯ নম্বর থেকে তা ছিল মাত্র এক ধাপ দূরে।

এ অর্জনের বিশেষত্ব হলো, আলফাপ্রুফ এককভাবে সমগ্র আসরের সবচেয়ে জটিল একটি প্রশ্নের সমাধান দিয়েছিল, যা সারাবিশ্বের ৬০৯ মানব প্রতিযোগীর মধ্যে মাত্র পাঁচজন সম্পূর্ণ করতে পেরেছিলেন। জ্যামিতির আরেকটি প্রশ্ন সমাধান করে আলফাজ্যামিতি ২। এই বৈপ্লবিক সাফল্য পরবর্তীতে নেচার জার্নালে পিয়ার-রিভিউ হয়ে প্রকাশিত হয়।

প্রচলিত লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল থেকে আলফাপ্রুফের কর্মনীতি সম্পূর্ণ আলাদা। এটি শক্তিশালী রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিং-এর ওপর ভিত্তি করে গঠিত, যে প্রযুক্তিতে ডিপমাইন্ডের ‘আলফাজিরো’ দাবায় বিশ্বসেরা মানুষকে পরাস্ত করেছিল। গণিতের জন্য এই মডেল ব্যবহার করে একটি ফর্মাল থিওরেম-প্রুভিং সিস্টেম ‘লিন’। লিন একটি স্বয়ংক্রিয় যাচাইকারী হিসেবে কাজ করে, যা প্রতিটি গাণিতিক যুক্তির ধাপ পরীক্ষা করে এবং সামান্য ত্রুটি ধরা পড়লে তা প্রত্যাখ্যান করে। প্রশিক্ষণ প্রদানের সময় প্রাথমিকভাবে প্রায় ১০ লাখ সাধারণ গণিতের সমস্যাকে লিনের আনুষ্ঠানিক ভাষায় রূপান্তর করা হয়। এরপর সেখান থেকে প্রায় ১০ কোটি জটিল ফরমাল সমস্যা প্রস্তুত করে সিস্টেমকে আরও কঠিন প্রমাণ অনুসন্ধানের শিক্ষা দেওয়া হয়। কোনো অলিম্পিয়াড সমস্যা সমাধানের সময় এটি বহু সম্ভাব্য সমাধানপথ অনুসন্ধান করে এবং লিনের সাহায্যে প্রতিটি ধাপ যাচাই করে গাণিতিকভাবে বৈধ প্রমাণে পৌঁছায়।

এআই-এর অগ্রগতি পরের বছর আরও দ্রুততর হয়। ২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে গুগলের উন্নত জেমিনি মডেল ছয়টির মধ্যে পাঁচটি প্রশ্নের সমাধান করে সরাসরি স্বর্ণপদকের সীমা স্পর্শ করে। একই আসরে ওপেনএআই-এর একটি সিস্টেমও একই কৃতিত্ব প্রদর্শন করে। ২০২৪ সালে যে প্রক্রিয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় প্রয়োজন হতো, ২০২৫ সালে তা অনেক সংক্ষিপ্ত হয়ে আসে।

অগ্রগতির ধারা ২০২৬ সালে আরও চমকপ্রদ মোড় নেয়। সে বছরের জুলাইয়ের একটি স্বাধীন বেঞ্চমার্ক পরীক্ষায় কোনো বিশেষায়িত গণিত-সিস্টেম ছাড়াই কয়েকটি সাধারণ-উদ্দেশ্যের এআই মডেল আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের প্রশ্ন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমাধানের প্রচেষ্টা চালায়। এ পরীক্ষায় ইন্টারনেট সংযোগ, মানব সহায়তা বা পর্যালোচক—সবই বন্ধ ছিল; শুধু মডেল ও একটি টার্মিনাল উপস্থিত ছিল। ফলাফল যাচাই করেছিল আলাদা ভেরিফায়ার এআই এজেন্ট, যারা প্রতিটি প্রমাণ প্রতীকী বীজগণিতে পুনর্মূল্যায়ন করে, সন্দেহজনক তথ্য কম্পিউটারে পরখ করে এবং ভুল ধরিয়ে দিতে কন্ট্রাডিকশন তৈরি করে।

নয়টি স্বয়ংক্রিয় মডেলের মধ্যে তিনটি পূর্ণ ৪২ নম্বর অর্জন করেছিল। বিস্ময়করভাবে, ক্লড ফেবল ৫ প্রথম চেষ্টাতেই ৪২-এ ৪২ নম্বর পায়, যা করতে সময় ও ব্যয় ছিল ন্যূনতম—মোট খরচ হয়েছিল মাত্র ৫১ ডলার। জিপিটি-৫.৬ সল ও কিমি কে৩ ভেরিফায়ারের ত্রুটি-নির্দেশনার ওপর ভিত্তি করে প্রমাণ সংশোধন করে শেষ পর্যন্ত পূর্ণ নম্বর অর্জন করে, যদিও কিমি কে৩-এর ক্ষেত্রে সময় লেগেছিল ১৭ ঘণ্টারও বেশি।

এই সব অর্জন সত্ত্বেও বাস্তবতা এখনও সীমাবদ্ধ। সমাধানে এখনও বিপুল কম্পিউটিং ক্ষমতার প্রয়োজন হয় এবং প্রতিটি প্রশ্নের জন্য পৃথক প্রকৌশলগত প্রস্তুতি দরকার হয়। এটি এখনও কোনো সাধারণ গাণিতিক বুদ্ধিমত্তার পরিচয় নয়, বরং একটি অতি-বিশেষায়িত ও সংকীর্ণ ক্ষেত্রে চূড়ান্ত দক্ষতার নিদর্শন। গণিত অলিম্পিয়াডের প্রমাণ-কেন্দ্রিক সংস্কৃতির জন্য এর বার্তা হতাশার নয়; বরং এটা এক নতুন সুযোগের ইঙ্গিত দেয় যে, ভবিষ্যতে এআই প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে গণিতজ্ঞদের সহকর্মী হয়ে উঠবে। যুক্তির শৃঙ্খলা অনুশীলনের ক্ষেত্র হিসেবে অলিম্পিয়াডের গুরুত্ব এখানেই যে, এই শৃঙ্খলা আয়ত্ত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো মানুষের হাতেই রয়ে গেছে।