পৃথিবী যে গোলাকার, এটি একটি বহুল পরিচিত ও বৈজ্ঞানিক সত্য। ১৯৫৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের 'স্পুতনিক-১' স্যাটেলাইট পুরো পৃথিবী প্রদক্ষিণ করার পর এর পক্ষে আরও জোরালো প্রমাণ মেলে। তারপরও সমতল পৃথিবীবাদীরা বা 'ফ্ল্যাট-আর্থাররা' ইন্টারনেটে এই যুক্তি দেন যে পৃথিবী চ্যাপটা। কিন্তু বিজ্ঞান বলে, কোনো গ্রহ যদি থালার মতো সমতল হতো, তাহলে তার পরিণতি এতটাই ভয়ংকর হতো যে সেখানে প্রাণের বিকাশই ঘটত না।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির (ক্যালটেক) গ্রহবিজ্ঞানী ডেভিড স্টিভেনসনের বক্তব্য অনুযায়ী, একটি মহাজাগতিক বস্তুকে গোল না করে সমতল করতে চাইলে প্রচণ্ড গতিতে ঘোরাতে হবে। এত দ্রুত ঘূর্ণনে বস্তুটি টিকে থাকতে পারত না, টুকরো টুকরো হয়ে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ত। ঊনবিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞানী জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল শনির বলয় নিয়ে গবেষণার সময় গাণিতিকভাবে প্রমাণ করেন যে, সমতল ও চ্যাপটা কোনো বিশাল বস্তু স্থায়ী হতে পারে না। তাঁর গণিতই পরে প্রমাণ করে যে, শনির বলয় পাথরের অসংখ্য ছোট ছোট টুকরো দিয়ে গঠিত, কোনো কঠিন চ্যাপটা বস্তু নয়।

মহাকাশে থালার মতো চ্যাপটা কোনো গ্রহের অস্তিত্ব না থাকার পেছনে ম্যাক্সওয়েলের সেই একই সূত্র কাজ করে। কোনো গ্রহকে ঘোরানো ছাড়া চ্যাপটা বানাতে পারলেও, সেটি মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই টিকতে পারত না। অভিকর্ষ বল চারপাশ থেকে কেন্দ্রের দিকে সমান টানে বস্তুটিকে আবার গোল করে ফেলত। ম্যাক্সওয়েলের সূত্র এটাই বল, মহাকর্ষীয় বল কাজ করলে সমতল পৃথিবীর অস্তিত্ব সম্পূর্ণ অসম্ভব।

মহাকর্ষ বলকে নিশ্চিহ্ন করে দিলে প্রকৃতির নিয়মই ধসে পড়ে। এই বল ছাড়া পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল থাকা সম্ভব নয়, কারণ মহাকর্ষই বাতাসকে গ্রহের গায়ে ধরে রাখে। সমুদ্রে জোয়ার-ভাটারেও ঘটনা ঘটত না, যা চাঁদের মহাকর্ষীয় টানের ফল। আর চাঁদই তো থাকত না। প্রচলিত তত্ত্ব মতে, বহু কোটি বছর আগে পৃথিবীতে বড় কোনো বস্তুর আঘাতের ছিটকে পড়া অংশ মহাকর্ষের টানে জড়ো হয়ে চাঁদ তৈরি করেছিল। অপর দুটি তত্ত্ব বল, চাঁদ পৃথিবীর সাথেই তৈরি হয়েছিল বা মহাশূন্যে ভ্রমণের সময় পৃথিবীর অভিকর্ষ তাকে ধরে ফেলেছিল। প্রতিটি ধারণাতেই মহাকর্ষ চাঁদের অস্তিত্বের মূল কারণ।

শুধু বাইরে নয়, পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠনের পেছনেও মহাকর্ষের ভূমিকা রয়েছে। এর টানেই ভারী উপাদানগুলো কেন্দ্রে জমা হয়েছে এবং হালকা উপাদানগুলো উপরিভাগে এসেছে। ভেতরের তরল স্তর একটি বিশাল চুম্বকের ভূমিকায় তৈরি করে চৌম্বকক্ষেত্র, যা সূর্যের ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে বায়ুমণ্ডলকে রক্ষা করে। মঙ্গল গ্রহের বায়ুমণ্ডল ধ্বংসের পেছনে তার চৌম্বকক্ষেত্র হারানোই কারণ।

কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূপদার্থবিদ জেমস ডেভিসের মতে, ভূপৃষ্ঠের টেকটোনিক প্লেটের চলাচল বা ভূমিকম্পের গণনা করতে হলে পৃথিবীকে গোলাকার ধরে নিতে হয়। সমতল ভূমির হিসাবে এই ফলাফল বাস্তবতার সাথে মিলতে পারে না। সমতল পৃথিবীর ব্যাখ্যাগুলোতেও কোনো বিজ্ঞান, গণিত বা বাস্তব ভিত্তি নেই। ম্যাক্সওয়েল যেখানে মহাকর্ষ ও ঘূর্ণনের গণিতে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, সেখানে সমতল পৃথিবীর পক্ষে এমন কোনো গাণিতিক ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। তারা প্রতিটি প্রাকৃতিক ঘটনার জন্য ভিন্ন ভিন্ন অসমর্থিত ব্যাখ্যা দাঁড় করান। কিন্তু বিজ্ঞানের নীতি হল, একটি মৌলিক তত্ত্ব দিয়েই বহু ঘটনার ব্যাখ্যা করা। একমাত্র মহাকর্ষই পৃথিবী ও চাঁদকে গোলাকার রূপ দিয়েছে। সমতল পৃথিবীর সমর্থকদের মহাজাগতিক ঘটনার জন্য সম্পূর্ণ পৃথক ও পরস্পরবিরোধী কারণ উদ্ভাবন করতে হয়, যা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সম্পূর্ণ বিপরীত। এক হাজার জটিল ব্যাখ্যার চেয়ে একটি সঠিক সূত্র দিয়ে হাজার ঘটনার ব্যাখ্যা দেওয়াই বিজ্ঞানের মূল ভিত্তি।