বাংলা সাহিত্যের অন্যতম দ্রোহ ও প্রেমের কবি হেলাল হাফিজের কবিতাজগৎ শুধু পাঠকই নয়, বরং সংগীত ও চলচ্চিত্র নির্মাতাদেরও অনুপ্রাণিত করেছে। তাঁর রচিত ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’, ‘প্রতিমা’, ‘প্রস্থান’, ‘অমীমাংসিত সন্ধি’, ‘তুমি ডাক দিলে’, ‘ফেরীওয়ালা’ ও ‘যাতায়াত’-এর মতো কবিতাগুলো বিভিন্ন সময়ে গানে রূপান্তরিত হয়েছে। বিশেষ করে ‘প্রস্থান’ কবিতাটি নিয়ে ইমন চৌধুরীর সুরে তানজীর চৌধুরীর কণ্ঠে ইউটিউবে প্রকাশিত গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এছাড়া ‘অমীমাংসিত সন্ধি’ কবিতাটি থেকে ‘দিন-দ্য ডে’ সিনেমায় বাংলা ও ফারসি দুই ভাষায় গান তৈরি হয়েছে; ফারসি অনুবাদ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুমিত আল রশিদ এবং গেয়েছেন বেলাল খান ও মোহাম্মদ রেজা হেদায়েতী। ‘তুমি ডাক দিলে’ কবিতাটি ‘আজব কারখানা’ চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে কবিতার লিরিক থেকে গান রূপায়িত হয়েছে ভাইকিংসের সংগীতায়োজনে। ‘ফেরীওয়ালা’ কবিতাও ওই ছবিতেই ‘কষ্ট’ শিরোনামে তন্ময় তানসেনের কণ্ঠে স্থান পেয়েছে। ‘আজব কারখানা’ ছবির আবহ সংগীত পরিচালক লাবিক কামাল গৌরব জানিয়েছেন, হেলাল হাফিজের চারটি লিরিক থেকে পাঁচটি গান তৈরি হয়েছে; যার মধ্যে ‘একবার ডাক দিয়ে দেখো আমি কতটা কাঙাল’ গানের দুটি ভার্সন (একটি ফোক, একটি রক) নিজেই করেছেন গৌরব এবং তিনটি রক গান করেছে ভাইকিংস।
কবির ব্যক্তিগত জীবনেও নানা ট্র্যাজেডি ও প্রেমের ছোঁয়া ছিল। ১৯৪৮ সালের ৭ অক্টোবর নেত্রকোনায় জন্মগ্রহণ করেন হেলাল হাফিজ। তাঁর বাবা খোরশেদ আলী তালুকদার ও মা কোকিলা বেগম। শৈশবে মাকে হারান এবং ১৯৭৩ সালে বাবাও মারা গেলে তিনি একা হয়ে পড়েন। বাবার মৃত্যুর মাসখানেক পর প্রেমিকা হেলেন বিচ্ছেদ ঘটালে তিনি ভেতরে ভেঙে পড়লেও বাইরে তা প্রকাশ করেননি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “ছোটবেলা থেকে আমার প্রচণ্ড সহ্যশক্তি। কথাটা শুনে ভেতরের ঝড় বুঝতে দিলাম না হেলেনকে। ওখান থেকে উঠে রিকশা নিয়ে চলে এলাম।” প্রেম-বিরহের এই অভিজ্ঞতাই তাঁর কবিতায় নানাভাবে ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে তাঁর বিখ্যাত কবিতার পঙ্ক্তি ‘অনেক কষ্টের দামে জীবন গিয়েছে জেনে/ মূলতই ভালোবাসা মিলনে মলিন হয়, বিরহে উজ্জ্বল’ এবং ‘এক জীবনে কতটা আর নষ্ট হবে,/ এক মানবী কতটা আর কষ্ট দেবে’ মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে দাগ কেটেছে।
১৯৮৬ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ তাঁকে অমর করে রাখে। এরপর ২০১২ সালে ‘কবিতা একাত্তর’ এবং ২০১৯ সালে ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’ প্রকাশিত হয়। ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। তাঁর সৃষ্টি ও জীবনযাত্রা বাঙালি সংস্কৃতির অমলিন সম্পদ হয়ে থাকবে।


