যে কোনো প্রতিষ্ঠান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় (এআই) বিনিয়োগ করলেই জানতে চায়, সেটি আদৌ ফলপ্রসূ হচ্ছে কিনা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর উত্তর খোঁজা হয় উৎপাদনশীলতা, দক্ষতা অথবা খরচ সাশ্রয়ের হিসেব কষে। এই মাপকাঠিগুলো যৌক্তিক হলেও, পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের হোয়ার্টন স্কুলের নতুন এক গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আরেকটি মাপকাঠি নেতৃত্বকে বিবেচনা করতে হবে। সংগঠনগুলো হয়তো এআইয়ের কর্মক্ষমতা মূল্যায়ন করতে গিয়ে মানুষ ও প্রযুক্তির যৌথ প্রয়াসে সৃষ্ট মূল্যায়নের গুরুত্বটুকু উপেক্ষা করছে।

গবেষণার তথ্যমতে, এআই মুহূর্তের মধ্যে বিষয়বস্তু তৈরি করতে পারলেও অভিজ্ঞতা, প্রসঙ্গ, এবং কোনো উত্তর বাস্তব পরিস্থিতির সাথে মানানসই হচ্ছে না— তা বোঝার ক্ষমতা নিয়ে আসে মানুষ। প্রকৃত মূল্য নিহিত রয়েছে এই পারস্পরিক সম্পর্কের মাঝে। তবুও এখনো অধিকাংশ সংগঠনই কর্মী ও প্রযুক্তির মূল্যায়ন করে পৃথকভাবে। অধ্যাপক ডেভ উলরিচ এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন, “মূল্য নির্ধারিত হয় গ্রহীতা দ্বারা, প্রদানকারীর মাধ্যমে নয়।” এআইয়ের বেলাতেও একই সূত্র প্রযোজ্য। এআই কেবল একটি উত্তর তৈরি করার মাধ্যমেই মূল্য সৃষ্টি করে না; যখন মানুষ সেই তথ্য উন্নততর সিদ্ধান্ত গ্রহণে কাজে লাগায়, তখনই প্রকৃত মূল্য নির্মিত হয়।

এআই গ্রহণের হার মাপার প্রচলিত ধারা রয়েছেই— কতজন কর্মী এটি ব্যবহার করছেন, কতবার ব্যবহার করছেন এবং এর ফলে সময় বাঁচছে কিনা। কিন্তু এই পরিসংখ্যানগুলো কখনই বলে দেয় না যে এআই কাজের অংশ হওয়ায় কর্মীরা আরও দক্ষ সমস্যা সমাধানকারী হয়ে উঠছেন কিনা। ধরুন, দুইজন ব্যবস্থাপক একই রকম কর্মমূল্যায়ন পেলেন। উভয়েই নির্ধারিত সময় ও বাজেটের মধ্যে প্রকল্প সম্পন্ন করেছেন। একজন এআই ব্যবহার করেছেন কেবল দ্রুত কাজ সারতে, আর অন্যজন এআইকে কাজে লাগিয়েছেন পূর্বধারণাগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানাতে, বিকল্প পরীক্ষা করতে এবং এমন একটি সমাধান খুঁজে বের করতে যা তার দল কখনো ভাবেইনি। প্রচলিত পরিমাপ পদ্ধতিতে এই দুইজনকে একই কাতারে ফেলা হতে পারে, কিন্তু সক্ষমতার দিক থেকে তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন। একজন এআইকে ব্যবহার করেছে শর্টকাট হিসেবে, অপরজন ব্যবহার করেছেন চিন্তার সহযোগী হিসেবেবে।

অনেক শীর্ষ কর্মকর্তা মনে করেন, কর্মীরা যতবার এআই ব্যবহার করছেন, ততই তারা এটি কার্যকরীভাবে কাজে লাগাচ্ছেন। কিন্তু কোনো বিশ্লেষণ না করেই এআইয়ের সুপারিশ হুবহু প্রতিবেদনে বসিয়ে দেওয়া কর্মী খুব বেশি অতিরিক্ত মূল্য তৈরি করে না। বারবার এআই ব্যবহারের অর্থ এই নয় যে, সেটি ভালোভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সাধারণত, যেসব কর্মীরা এআইয়ের পরামর্শকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন, সেগুলোর উন্নতি সাধন করেন এবং নিজের বিবেচনা বোধ কাজে লাগিয়ে তবেই এগোন, তারাই সর্বাধিক মূল্য সৃষ্টি করেন।

তাই নেতৃত্বের উচিৎ কম সময় ব্যয় করা, ‘কর্মীরা এআই ব্যবহার করছে কিনা’—এই প্রশ্নে। বরং খোঁজ নেওয়া দরকার, তাঁরা এটি কীভাবে ব্যবহার করছেন। তারা কি প্রথম উত্তরটিই সাদরে গ্রহণ করছেন, নাকি তাকে পরিমার্জিত করছেন? তারা কি নিজের চিন্তা প্রতিস্থাপনে এআইকে কাজে লাগাচ্ছেন, নাকি সেটিকে আরও দৃঢ়তর করতে? এই প্রশ্নগুলোই মানব-এআই সহযোগিতার মূল্য সৃষ্টি সম্পর্কে অনেক স্পষ্ট ধারণা দেয়।

কর্মমূল্যায়ন পদ্ধতিতে গত এক দশকে সামান্যই পরিবর্তন এসেছে, যদিও কাজের ধরনে নাটকীয় রূপান্তর ঘটেছে। বেশিরভাগ সংগঠন এখনও ব্যক্তিগত অর্জনকে পুরস্কৃত করে, কিন্তু একজন কর্মী কিভাবে এআই ব্যবহার করে কাজের গুণগত মান বাড়িয়েছেন, তা দেখা হয় না। এটা একটি ব্যয়বহুল দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়ার শামিল। যেসব কর্মীরা এআইকে চ্যালোচোঞ্জ জানানো, তার প্রস্তাব পরিশোধন এবং প্রযুক্তিকে মানবিক বিচারের সাথে মেশাতে পারেন, তারা ভবিষ্যতে অত্যন্ত মূল্যবান দক্ষতা তৈরি করছেন। এই আচরণগুলো যদি স্বীকৃতি না পায়, তবে তাদের আরও শক্তিশালী করার কোনো কারণ থাকবে না।

নিজেদের পরিমাপ ব্যবস্থা উন্নত করার অন্যতম সহজ রাস্তা হলো প্রশ্নগুলোকেই উন্নত করা। কোনো প্রকল্প সফল হলে, কেবল ‘এআই সময় বাঁচিয়েছে কি?’ জিজ্ঞেস করলেই থামবেন না। বরং জানতে চান, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পেছনে এআই কতটা ভূমিকা রেখেছে? এআইয়ের পরামর্শ বাস্তবে প্রয়োগের আগে কর্মীরা সেটিকে আরও সমৃদ্ধ করেছিলেন কিনা? এআই কি এমন কোনো তথ্য উন্মোচন করেছের যা ফলাফল বদলে দিয়েছিল? এই আলোচনা থেকেই প্রায়শই এমন অবদানগুলো সামনে আসে, যা উৎপাদনশীলতার কোনো রিপোর্ট কখানোতে ধরা পড়ে না। দীর্ঘ মেয়াদে, এই কথোপকথনগুলি সেই কর্মীদের চিহ্নিত করবে, যাঁরা নিজ দক্ষতা ও এআইয়ের মেলবন্ধনে ধারাবাহিকভাবে বেশি মূল্য সৃজন করছেন এবং যাঁরা গোটা প্রতিষ্ঠানে এআইয়ের কার্যকর ব্যবহার শিক্ষা দিতে পারেন।

এআই ভবিষ্যতে আরও দ্রুত, সাশ্রয়ী এবং শক্তিশালী হতে থাকবে। তবে সাফল্যের নির্ণায়ক সেটি নাও হতে পারে। বরং বড় অগ্রগতির সুযোগ লুকিয়ে আছে সেইসব লোক তৈরি করতে, যারা এআইয়ের সাথে কার্যকরীভাবে যৌথ কাজ করতে, এটিকে ভেবেচিন্তে প্রশ্ন করতে এবং এর উৎপাদন উন্নত করতে জানে। যেসব নেতৃত্ব এই ক্ষমতাগুলো পরিমাপ করতে পারবেন, তারাই দেখতে পাবেন কোথায় এআই প্রকৃত মূল্য বয়ে আনছে এবং ভবিষ্যতের বিনিয়োগ থেকে সবচেয়ে বেশি প্রতিদান মেলে। শেষ বিচারে, এআই থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো তারাই হবে, যারা মানব-এআই সহযোগিতাকে চিনতে, পরিমাপ করতে ও উৎসাহিত করতে সবচেয়ে পারদর্শী।