বিদেশে উন্নত জীবনের মরীচিকা দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে লিবিয়ায় পাচার করে জিম্মি করা, নির্মম নির্যাতন চালিয়ে পরিবারের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা মুক্তিপণ আদায় – এমন একটি আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্রের বিরুদ্ধে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মামলা দায়ের করেছে। গত ১৩ এপ্রিল দায়ের করা এ মামলায় নড়াইলের কালিয়া উপজেলার সাতবাড়িয়া গ্রামের আলাউনাকিন শেখ, আওয়াল ফরজীসহ মোট ৩৪ জনকে আসামি করা হয়েছে।
সিআইডির আর্থিক অপরাধ দমনের বিভাগের এক অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে, ইতালিতে কর্মসংস্থানের প্রলোভন দেখিয়ে ভুক্তভোগীদের লিবিয়ায় নিয়ে নির্যাতন ও বন্দি রেখে মুক্তিপণ আদায়ের এই সংঘবদ্ধ চক্রটি গত পাঁচ বছরে বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ৩৭৬ কোটি ৫০ লাখ টাকারও বেশি লেনদেন সম্পন্ন করেছে। সংগঠনটি দেশের ১১টি জেলা জুড়ে তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করেছে। প্রথম আলোর অনুসন্ধান অনুযায়ী, মুক্তিপণ থেকে অর্জিত বিপুল অঙ্কের টাকা দিয়ে চক্রের সদস্যরা তাদের ভাগ্য বদলে ফেলেছেন। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ ন্যালোর জেলা সদর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরের সাতবাড়িয়া বাজারের আলী শেখা ও আওয়াকেন ফরাজিরা। আলাউনদিনের দৃষ্টিনন্দন দ্বিতল বাড়ি, গরুর খামার এবং খুলনায় দামি গাড়ির তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁর পিতা আলী শেখা একসময়ের কৃষিজীবী অবস্থার কথা স্বীকার করে বলেছেন, “ছেলে বিদেশ যাওয়ার পর থেকেই আমাগে পরিবর্তন হয়েছে।” তবে তাদের দাবি, আলাউদিন লিবিয়ায় ঠিকাদারি করতেন এবং শ্রমিক পাঠিয়ে বৈধভাবে অর্থ উপার্জন করতেন।
কিন্তু তদন্ত সংশ্লিষ্ট সিআইডির কর্মকর্তারা বিষয়টি অস্বীকার করে জানান, আলাউদিন চক্রের সমন্বয়ক হিসেবে লিবিয়ায় বন্দীদের আটকে রাখা এবং দেশে সদস্যদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে মুক্তিপণ আদায়ের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি ১২ বছর আগে লিবিয়ায় গিয়ে পরবর্তীতে মানব পাচারের সঙ্গে যুক্ত হন। একইভাবে আওয়াক ফরাজী ও তার দুই ভাই রাব্বানী ও রুবেল চক্রটির সক্রিয় সদস্য। আওয়াক ফরাজী বর্তমানে পলাতক। তার মা হারিচা বেগম দাবি করেন, “আগে কয়দিন বিদেশে লোক নেছেলো... মেলে মানুষ গেছে, কোনো অ্যাকসিডেন্ট হয়নি।” কিন্তু বাস্তবতার চিত্র ভয়াবহ। গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের আখ্যা বেগম নামের এক নারীর পরিবারের পাঁচজনকে ইতালি যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে লিবিয়ায় জিম্মি করা হয়। সেখান থেকে নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে চক্রটি আরও ৭৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করে। এ ধরনের নির্যাতনের শিকারদের সংখ্যা নেহাত কম নয়।
মানব পাচার, জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় এবং হুন্ডি কারবার – এই তিন অপরাধ একই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হতো। সিআইডি জানতে পেরেছে যে, অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ গোপন করতে কমিশন দিয়ে গৃহিনী, ওষুধের দোকানমালিক এমনকি মুদিদোকানির ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হয়েছে। তদন্তে চক্রটির ব্যবহৃত কমপক্ষে ১১৪টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও ১৮টি নামসর্বস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান শনাক্ত করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর করা হতো। নিউজিলের ‘শুকুর মেডিকেল হল’ নামের একটি দোকানের অ্যাকাউন্টে মাত্র দুই বছরে প্রায় দুই কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে, যা এই আর্থিক অনিয়মের চিত্র স্পষ্ট করে।
অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর ধারণা, দেশের বিভিন্ন এলাকায় এ রকম অন্তত অর্ধশত চক্র সক্রিয় আছে, যাদের অধিকাংশ সদস্যই একই পন্থায় অভাবনীয় সম্পদের মালিক হয়েছেন। সিআইডির অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) মুহাম্মদ বাসির উদ্দিন নিশ্চিত করেছেন যে, চক্রের সদস্যদের অবৈধ সম্পদের বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধান চলছে। ব্র্যাকের একটি জরিপেও লিবিয়ায় জিম্মি ও নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। সংস্থাটি জানায়, ফেরত আসা ৫৫৭ জনের মধ্যে ৬৩ শতাংশ লিবিয়ায় যাওয়ার পথেই বন্দী হয়েছিলেন এবং ৯৩ শতাংশকে বিভিন্ন ক্যাম্পে আটক করে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম মনে করেন, জড়িতদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি তাদের সম্পদও বাজেয়াপ্ত করা একান্ত আবশ্যক। তদন্তকারী সংস্থার ধারণা, অনুসন্ধান শেষ হওয়ার পর চক্রটির সঙ্গে যুক্ত আরও ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম সামনে আসবে।




