আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রকৃত জঙ্গি বলতে আর কাউকে পাওয়া যায়নি বলে মন্তব্য করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম অভিযোগ করেছেন, পশ্চিমা বিশ্বের ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ বা ‘ওয়ার অন টেরর’ কে পুঁজি করে বাংলাদেশে নাটক সাজিয়ে মানুষ হত্যা করা হতো। রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ ২০১৬ সালে গাজীপুরের জয়দেবপুরে ‘জঙ্গি আস্তানা’ সাজিয়ে সাতজনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এই অভিযোগ তোলেন। ওই দিন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের আবেদনের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার বলেন, বিদায়ী সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচকদের টার্গেট করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জঙ্গি নাটকের আয়োজন করত। তিনি উল্লেখ করেন, দু-একজন জঙ্গি থাকার সম্ভাবনা থাকলেও তাদের গুলি করে হত্যার কোনো আইনি সুযোগ ছিল না; বরং তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনেই বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা উচিত ছিল।
এই মামলায় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক একে এম শহীদুল হক, মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারীসহ মোট ১০ জন আসামি। অন্যান্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া, কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) সাবেক প্রধান মো. মনিরুল ইসলাম এবং ডিএমপির সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ। এদের মধ্যে শহীদুল হক ও আছাদুজ্জামান মিয়া বর্তমানে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন এবং রোববারের শুনানিতে তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। বাকি আসামিরা বর্তমানে পলাতক।
শুনানির একপর্যায়ে গাজী মোনাওয়ার সাত খুনের একটি নির্দিষ্ট ঘটনার বিবরণ দেন। তিনি জানান, ভুক্তভোগী মাদ্রাসাছাত্র মো. ইব্রাহীম ইসলামিক গান গাওয়ার সুবাদে নজরে আসে। তার ফেইসবুক অ্যাকাউন্টে তৎকালীন সরকারের সমালোচনামূলক পোস্ট দেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাকে লক্ষ্যবস্তু করে, যদিও তাদের মধ্যে কোনো পূর্ব শত্রুতা ছিল না। পরে ইব্রাহীমকে বিভিন্ন স্থান থেকে ধরে আনা অন্যদের সাথে জয়দেবপুরের একটি বাসায় জড়ো করে রাখা হয় এবং ‘জঙ্গি দমন’ নামে এক অভিযানে হত্যা করা হয়।
এই হত্যাযজ্ঞ পরিচালনায় সোয়াট দলকে ব্যবহার করার বিষয়টি।ও শুনানিতে উঠে আসে। প্রসিকিউটর জানান, প্রায় ৫০ সদস্যের ওই সোয়াট টিম যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সিটিটিসি-র অধীনে কাজ করত। তিনি অভিযোগ করে বলেন, সোয়াট সদস্যরা নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে অজ্ঞাত ব্যাক্তিদের ওপর গুলি চালিয়ে চলে আসতেন, অনেক ক্ষেত্রেই তারা জানতেন না যে তাদের টার্গেট কে। এই পুরো কৌশলের পেছনে 'সুপিরিয়র' বা উচ্চপর্যায়ের নীতি-নির্ধারকদের ভূমিকা ছিল উল্লেখ করে গাজী মোনাওয়ার বলেন, এ কারণেই মামলায় শুধু নিচের সারির কর্মীদের নয়, বরং পরিকল্পনা ও নির্দেশদাতা ব্যক্তিদেরই আসামি করা হয়েছে।
প্রসিকিউটর আরও বলেন, আগের আমলে জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগের মামলা শুনতে বিচারকরা অস্বীকৃতি জানাতেন। এর ফলে একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় যেখানে, অপরাধ প্রমাণিত হলে একজন আসামি হয়তো ১০ বছরের কারাদণ্ড পেতেন, কিন্তু জঙ্গি মামলায় অভিযুক্ত হলে বিচারই না হওয়ার কারণে অভিযুক্ত ব্যক্তি বিনা রায়ে ১১ বছর কারাগারে আটকে থাকতেন। ট্রাইব্যুনাল মামলাটির পরবর্তী শুনানির জন্য ১০ আগস্ট দিন ধার্য করে দিয়েছেন। ওই দিন আসামিপক্ষ তাদের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ পাবে।




