প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক জেনো এলিয়াটিক মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন, যা অনুসারে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎ বিভ্রম মাত্র। তিনি তাঁর বিখ্যাত প্যারাডক্সগুলোর মাধ্যমে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে গতি ও সময়ের অস্তিত্ব নেই। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত প্যারাডক্স হলো 'অ্যাকিলিস ও কচ্ছপের দৌড়'। এই প্যারাডক্স অনুযায়ী, গ্রিক বীর অ্যাকিলিস একটি ধীর গতির কচ্ছপকে কিছুটা সামনে থেকে দৌড় শুরু করার সুযোগ দিলে তিনি কখনোই কচ্ছপকে ধরতে পারবেন না। কারণ অ্যাকিলিস যখনই কচ্ছপের পূর্ববর্তী অবস্থানে পৌঁছান, কচ্ছপ ইতিমধ্যে আরও একটু এগিয়ে যায়। এভাবে অসীম সংখ্যক ধাপ তৈরি হয় এবং জেনোর মতে, এই ধাপগুলো অতিক্রম করতে অসীম সময় লাগে।
জেনো ছিলেন আরেক দার্শনিক পারমেনাইডিসের শিষ্য। তিনি নিজে কোনো নতুন তত্ত্ব দেননি, বরং অন্যদের যুক্তি খণ্ডনে দক্ষ ছিলেন। আরিস্টটল তাঁকে যুক্তিতর্কের জনক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। জেনো প্রায় ৪০টি প্যারাডক্স রচনা করেছিলেন, যার মধ্যে অ্যাকিলিস, ডিকোটমি, স্টেডিয়াম ও অ্যারো উল্লেখযোগ্য। এগুলোর মূল প্রতিপাদ্য ছিল, আমরা যা গতি বলে চিহ্নিত করি, তা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত।
কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান ও গণিত এই ধারণা ভুল প্রমাণ করে। প্রাচীন গ্রিকদের কাছে অসীম ধারা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় তারা মনে করতেন অসীম সংখ্যক ভগ্নাংশের যোগফল অসীম হবে। তবে গণিতের গুণোত্তর ধারা তত্ত্ব বলে, নির্দিষ্ট কিছু অসীম ধারার যোগফল একটি সসীম সংখ্যায় পৌঁছে। যেমন, ১ + ১/২ + ১/৪ + ১/৮ + ... ধারাটির যোগফল ২-এর বেশি হয় না।
প্যারাডক্সটিকে বাস্তবের সাথে মিলিয়ে দেখা যাক। ধরুন, অ্যাকিলিসের বেগ সেকেন্ডে ১০ মিটার এবং কচ্ছপকে ১০০ মিটার এগিয়ে থেকে শুরু করা হলো। জেনোর ধাপগুলো অনুসারে সময়ের বিভাজন হবে: প্রথমে ৫ সেকেন্ডে অ্যাকিলিস কচ্ছপের প্রারম্ভিক বিন্দুতে পৌঁছায়, এরপর ২.৫ সেকেন্ডে পরবর্তী ধাপ, এভাবে ১.২৫, ০.৬২৫ সেকেন্ড ইত্যাদি। এই অসীম ধারার যোগফল ঠিক ১০ সেকেন্ড। ফলে ১০ সেকেন্ড পরেই অ্যাকিলিস কচ্ছপকে অতিক্রম করে ফেলেন।
পদার্থবিজ্ঞানের গতি সূত্র অনুযায়ী, বস্তু নির্দিষ্ট বেগে চললে তাদের মধ্যকার দূরত্ব নির্দিষ্ট হারে কমতে থাকে। তাই অসীম সংখ্যক ধাপ থাকলেও সসীম সময়েই গতি সম্পন্ন হয়। জেনোর প্যারাডক্সের ভিত্তি ছিল অসীম সম্পর্কে ভুল ধারণা। আধুনিক আবিষ্কারের ফলে আমরা এখন জানি, অসীম সংখ্যক বিভাজন বাস্তবে কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে না। অ্যাকিলিস যেমন কচ্ছপকে ধরতে পারেন, তেমনি প্রতিটি গতিশীল বস্তুই তার গন্তব্যে পৌঁছাতে সক্ষম।
এই প্যারাডক্স আজও দার্শনিক ও বিজ্ঞানীদের কাছে আলোচিত, এবং এটি চিন্তার সীমানা প্রসারিত করতে সাহায্য করে। শিক্ষার্থীদের জন্য এটি গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক ধারণা বোঝার একটি চমৎকার উদাহরণ।



