যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক প্রোগ্রাম কোঅর্ডিনেটর ড. আহমেদ শামীম সম্প্রতি এক গবেষণায় জসীমউদদীনের কালজয়ী উপন্যাস ‘বোবা কাহিনী’ (১৯৬৪) নিয়ে নতুন করে আলোচনা করেছেন। তাঁর মতে, উপন্যাসটি কেবল একজন দরিদ্র কৃষকের করুণ কাহিনি নয়; বরং এটি ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে সমগ্র নিম্নবর্গের বোবাকরণের একটি নিখুঁত চিত্র।
উপন্যাসের পটভূমি গত শতাব্দীর বিশ-ত্রিশ দশকের বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল। সেখানে মুসলমান সমাজের একেবারে নিচুতলার মানুষদের জীবনযুদ্ধ তুলে ধরা হয়েছে। নায়ক আজাহের এক ছিন্নমূল চাষির সন্তান, যার স্বপ্ন ছিল নিজের জমি ও ফসলের মাধ্যমে সুখী হওয়া। কিন্তু বারবার ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার কাছে পর্যুদস্ত হয়ে সে হারিয়ে ফেলে তার কর্তাসত্তা।
ড. শামীম গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের ‘Can the Subaltern Speak?’ তত্ত্বের আলোকে উপন্যাসটি পড়েছেন। তাঁর ব্যাখ্যায়, ‘সাবঅলটার্ন’ বলতে বোঝায় সেই সব মানুষ যারা কেবল দরিদ্র নয়, বরং জ্ঞান, আইন ও ক্ষমতার কাঠামো থেকেও বিচ্ছিন্ন। আজাহের কথা বলতে পারে, কিন্তু তার কথা সমাজে শোনা বা কার্যকর হয় না—এটাই তার বোবাত্ব।
উপন্যাসের প্রথম বাক্যই ‘আজাহেরের কাহিনী কে শুনিবে?’—এই প্রশ্নের মাধ্যমে লেখক ইঙ্গিত দেন যে এই কাহিনির কোনো শ্রোতা নেই। আজাহেরের পাট বিক্রির দৃশ্যে দেখা যায়, ব্যাপারী অছিমদ্দী কোম্পানির স্ট্যান্ডার্ড ওজন ও ইংরেজি ভাষার ভয় দেখিয়ে তাকে ঠকায়। আজাহের নিজের মেপে রাখা ছাব্বিশ মণ পাটের বদলে বিশ মণ মেনে নিতে বাধ্য হয়। ‘কোম্পানির বাটখারা’ এখানে বৈধতা ও শাসনের প্রতীক হয়ে ওঠে।
পরে সুদের ব্যাপারী শরৎ সাহার হাতে জমি ও ঘর হারানোর ঘটনায় আদালতের পিয়ন ‘চাপরাশ’ দেখিয়ে গ্রামবাসীকে ভীত করে তোলে। মাতবর মিনাজদ্দীসহ সবাই নীরব দর্শকে পরিণত হয়। আজাহের তার গরু দুটিকে ‘বোবাধন’ বলে ডাকে, যা উপন্যাসের শিরোনামের প্রতিধ্বনি।
তবে উপন্যাসে আশার আলো হিসেবে দেখা যায় আজাহেরের ছেলে বছিরকে। সে শিক্ষার মাধ্যমে ম্যালেরিয়ার মতো গ্রামীণ সমস্যা সমাধানের স্বপ্ন দেখে। ড. শামীম মনে করেন, জসীমউদদীন আধুনিক শিক্ষাকে সামাজিক রূপান্তরের হাতিয়ার হিসেবে দেখেছেন, কিন্তু তা ব্যক্তিগত সাফল্যের বাইরে গিয়ে সামষ্টিক মুক্তি নিশ্চিত করতে পারে কি না—সেই প্রশ্ন উন্মুক্ত রেখেছেন।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, ঔপনিবেশিক চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও ভূমি আইন কৃষকদের ভূমিহীন করে সুদের ব্যাপারীদের খপ্পরে ফেলে। ব্রিটিশ শাসকদের নিজস্ব রিপোর্টও স্বীকার করে যে এই ব্যবস্থা নিম্নবর্গকে চরম নিপীড়নের শিকার করেছে। ড. শামীমের মতে, জসীমউদদীনের উপন্যাসটি আজও প্রাসঙ্গিক, কারণ নব্য ঔপনিবেশিক শোষণের বাটখারা এখনও কার্যকর।


