জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) আগামী শিক্ষাবর্ষ অর্থাৎ ২০২৭ সাল থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে চারটি নতুন পাঠ্যবই সংযোজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত বই দুটি হলো 'খেলাধুলা' ও 'বাংলাদেশের সংস্কৃতি', অপরদিকে ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য বরাদ্দ বই দুটি হচ্ছে 'আমার কারিগরি শিক্ষা' এবং 'আনন্দময় শিখন (লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস)'। এসব বইয়ের বিষয়বস্তুর খসড়া কাঠামো ইতোমধ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে, যা দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে চূড়ান্ত রূপ পেতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিটিবির একজন কর্মকর্তা জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে নির্ধারিত সময়ে বইগুলোর বিষয়বস্তু চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি, তবে আশা করা হচ্ছে আগামীকাল মঙ্গলবারের মধ্যে তা সম্পন্ন হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি তদারক করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একদল শিক্ষক, যাদের নেতৃত্বে বই পরিমার্জন ও শিক্ষাক্রম উন্নয়নের কাজ চলছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে একটি কর্মশালার মাধ্যমে এ সংক্রান্ত শেষ পর্যায়ের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
কর্মশালার উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, 'লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস' হলো শিক্ষাব্যবস্থার একটি মৌলিক দর্শন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এটিকে শুধু একটি পৃথক বিষয় হিসেবে নয়, বরং গণিত, বাংলা, ভূগোল বা ইতিহাসের মতো প্রতিটি বিষয়ের অভ্যন্তরেই এই দর্শনের প্রতিফলন ঘটানোই তাদের লক্ষ্য। খেলাধুলা ও সংস্কৃতি বিষয়ক বই দুটিকে প্রচলিত পাঠ্যবইয়ের চেয়ে অধিকতর ব্যতিক্রমী ও ভিন্নধর্মী করে তোলার ওপরও তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন। কারিগরি শিক্ষার বই সম্পর্কে উপদেষ্টা মন্তব্য করেন, এর মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করা।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এবং যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক।
খসড়া কাঠামো অনুযায়ী, চতুর্থ শ্রেণির 'খেলাধুলা' বইটিতে আটটি নির্দিষ্ট খেলাকে কেন্দ্র করে বিষয়বস্তু সাজানো হবে। খেলাগুলো হলো ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, কাবাডি, দাবা, অ্যাথলেটিকস, সাঁতার এবং মার্শাল আর্ট। পাশাপাশি খেলাধুলার সাধারণ ধারণা, গুরুত্ব, উপকারিতা এবং বিভিন্ন ধরনের খেলা নিয়েও আলোচনা থাকবে। একটি বিশেষ অধ্যায় থাকবে 'শরীরচর্চা ও ব্যায়াম' শিরোনামে, যেখানে ওয়ার্মআপ, স্ট্রেচিং, ফ্রি-হ্যান্ড ব্যায়াম, শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ ও শরীরচর্চার উপকারিতার মতো বিষয়গুলো স্থান পাবে। এছাড়া খেলাধুলা ও মানসিক প্রশান্তির সম্পর্ক, ক্রীড়া ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ও প্রাথমিক চিকিৎসা এবং 'নতুন কুঁড়ি ক্রীড়া' নামে আলাদা বিষয়বস্তুও অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট এক শিক্ষক জানান, বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ হ্রাস পাওয়ায় তাদের পুনরায় মনোযোগী করে তুলতেই এই বই প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে 'বাংলাদেশের সংস্কৃতি' বইটি শিক্ষার্থীদের নিজ দেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে পরিচিত করানোর লক্ষ্যে তৈরি করা হচ্ছে। এতে 'আমি ও আমার সংস্কৃতি' অধ্যায়ে সংস্কৃতির ধারণা, ব্যক্তিজীবনে এর প্রভাব এবং আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর আলোকপাত করা হবে। 'উৎসব ও ঐতিহ্য' অংশে পয়লা বৈশাখ, নবান্ন, বিজয় দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি সহ জাতীয়, ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করা হবে। তাছাড়া 'শিল্প-সংস্কৃতি' অধ্যায়ে সংগীত, নৃত্য, নাটক, চিত্রকলা, কারুশিল্প ও হস্তশিল্পের চর্চার প্রয়োজনীয়তা উঠে আসবে। গ্রামীণ মেলা, লোকজ খেলা, লোকগান, লোকনৃত্য, প্রবাদ-প্রবচন, ঐতিহ্যবাহী ও আঞ্চলিক পোশাকের বৈচিত্র্য, অলংকার, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও অন্যান্য জনগোষ্ঠীর ভাষা, উৎসব, জীবনধারা, ঋতুবৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক জীবন এবং বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের ধারণাও এই বইয়ের বিভিন্ন অধ্যায়ে স্থান পাবে। তবে চূড়ান্ত অনুমোদনের সময় একাধিক অধ্যায় একীভূত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক ইঙ্গিত দিয়েছেন।
ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য প্রস্তাবিত 'আমার কারিগরি শিক্ষা' বইটির মুখ্য উদ্দেশ্য হবে শিক্ষার্থীদের মাঝে কারিগরি শিক্ষার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করা। এখানে দৈনন্দিন জীবনে দক্ষ মানুষের অবদান, দক্ষতা ও পেশার মর্যাদা, সমস্যা সমাধানে কারিগরি দক্ষতার প্রয়োগ, নিরাপদভাবে কাজ শেখা, দক্ষতা বিষয়ে প্রচলিত ধারণার পরিবর্তন, সমাজ ও জাতীয় উন্নয়নে দক্ষ মানুষের ভূমিকা এবং পর্যবেক্ষণ ও সঠিক পদ্ধতি অনুধাবনের মতো নানাবিধ বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
একই শ্রেণির আরেকটি বই 'আনন্দময় শিখন'-এর বিভিন্ন অধ্যায়ে শরীরচর্চা, দেহের যত্ন, বিনয়, কৃতজ্ঞতা, প্রকৃতিকে উপভোগ করা এবং সুখী হওয়ার মতো জীবনমুখী শিক্ষা প্রদান করা হবে। 'প্রিয় ও ভালোবাসার মানুষদের সঙ্গে থাকা' শীর্ষক একটি অধ্যায়ে ইতিবাচক সম্পর্কের সঙ্গে আনন্দের সংযোগ, ভালো বন্ধুর গুণাবলি এবং নেতিবাচক সঙ্গের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরা হবে। প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত এক শিক্ষক জানিয়েছেন, এসবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিবিধ মানবিক মূল্যবোধ সঞ্চারিত করাই মূল অভিপ্রায়। উল্লেখ্য, ২০২৮ সালের মধ্যে আরও বড় পরিসরে শিক্ষাক্রম পরিমার্জনের পরিকল্পনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের।



