স্পেন দলের সাফল্যের পেছনে প্রায়ই এক নীরব কারিগরের কথা উঠে আসে, যাঁর কারসাজি সহজে নজরে পড়ে না। পুতুলনাচের দৃশ্যমান পুতুল নয়, বরং সুতো যাঁর হাতে তিনিই আসল নিয়ন্ত্রক। লুইস দে লা ফুয়েন্তের দলে এই ভূমিকায় অবিচল রদ্রি। কোচ নিজেই বলেছেন, দলে রদ্রির উপস্থিতি এক ধরনের সৌভাগ্য। ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে তাঁর কাজটাই এমন যে পুরো ম্যাচে তিনি দৃশ্যমান নাও থাকতে পারেন, কিন্তু মাঝমাঠকে সূক্ষ্মভাবে একসূত্রে বেঁধে রাখার কাজটি নিভৃতে সম্পন্ন করেন।
ফ্রান্সের সঙ্গে সেমিফাইনাল ম্যাচটি এর উজ্জ্বল উদাহরণ। স্পেনের দ্বিতীয় গোলটি দেখার সময় অনেকের চোখ পেদ্রো পোরো বা দানি ওলমোর অবদানে আটকে থাকলেও পুরো আক্রমণের উৎসমুখে ছিলেন রদ্রিই। শুধু চোখে দেখাই শেষ কথা নয়, পরিসংখ্যানও তাঁর আধিপত্যের সাক্ষ্য দেয়। চলতি বিশ্বকাপে তিনি মোট ৬৫৫টি পাস সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন, যা একক আসরে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে ৯৪ শতাংশ পাসই নির্ভুল গন্তব্যে পৌঁছেছে। ফ্রান্সকে পুরো সময় ধরে ফাঁসুড়ের মতো আটকে রেখে যে দমবন্ধ করা পরিস্থিতি তৈরি করেছিল স্পেন, সেটির ভিত্তিও স্থাপন করেছিলেন এই মিডফিল্ডার।
গত দুই বছর রদ্রির ক্যারিয়ার উত্থান-পতনে ভরা। ২০২৩ সালে ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে ট্রেবল জয়ের পর ২০২৪ ইউরোতে স্পেনের শিরোপা জয়ে রেখেছিলেন অনবদ্য ভূমিকা এবং টুর্নামেন্ট সেরার স্বীকৃতি আদায় করেছিলেন। পরে ব্যালন ডি’অর পুরস্কারও ওঠে তাঁর হাতে। কিন্তু এর মাঝেই লিগামেন্টের বড় চোট তাঁকে দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে ঠেলে দেয়। চোট কাটিয়ে ক্লাবে ফিরলেও আগের ছন্দ পাওয়া নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছিল। বিশ্বকাপের আগে কোচের কাছে তাই নিয়মিত প্রশ্ন ওঠে—রদ্রি কি আদৌ আগের অপরিহার্য রূপে ফিরতে পারবেন?
ফ্রান্স ম্যাচ শেষে সেই জবাবটা জোরালোভাবেই দিয়েছেন কোচ দে লা ফুয়েন্তে। তাঁর ভাষায়, ‘আমাদের ফুটবল দর্শনের জন্য রদ্রিই আদর্শ খেলোয়াড়। ওকে নিয়ে প্রশ্ন করাটাই অপমানজনক। দলের ভারসাম্য রক্ষা আর প্রতিপক্ষের বল কেড়ে নেওয়ার যে সংখ্যা, তা গুনে শেষ করা যাবে না।’ রদ্রি যেন একটি নদীর প্রধান উৎস, যেখান থেকে স্পেনের আক্রমণের ধারা বিভক্ত হয়—একটি যায় ফাবিয়ান রুইজের সৃজনশীলতায়, আরেকটি ছুটে যায় ওলমোর গতিতে। যখন রুইজ ও ওলমো বল পান, তাদের পেছনের জায়গা সুরক্ষিত রাখার দায়িত্বটা রদ্রির। বল হারানোর দু-তিন সেকেন্ডের ভেতর প্রতিপক্ষকে চেপে ধরার যে কৌশল স্পেন নিয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দুও এই মিডফিল্ডার।
রদ্রির ওপর এই আস্থা রাখার পেছনে কোচের নিজস্ব অভিজ্ঞতাও কাজ করেছে। ২০১৫ সালে স্পেনের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে রদ্রির অভিষেকের সময় থেকেই দে লা ফুয়েন্তে তাঁর কোচ ছিলেন। একসঙ্গে তাঁরা ইউরোপিয়ান অনূর্ধ্ব-১৯ শিরোপা জিতেছিলেন। মিকেল মেরিনো, উনাই সিমন, ফাবিয়ান রুইজ, ওলমো, মিকেল ওইয়ারসাবাল—এই পুরো প্রজন্ম একসঙ্গে বেড়ে উঠেছে, একই ফুটবল দর্শনে বিশ্বাসী হয়ে। মাঠের ভেতরে ও বাইরের এই সমন্বয় ও রসায়নই স্পেনকে টেনে নিয়ে এসেছে আরেকটি বিশ্বকাপ শিরোপার দোরগোড়ায়, যার ভরকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছেন রদ্রি।




