২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের বিস্তৃত পরিধি ও ব্যাপক ভ্রমণসূচির কারণে ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফ্যান্টিনোর উড়ান কার্যক্রম ছিল নজিরবিহীন। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) সম্প্রতি এক বিশ্লেষণে দেখিয়েছে যে, টুর্নামেন্ট চলাকালে তিনি প্রায় ৫৯,২৮১ মাইল (৯৫,৪০৩ কিলোমিটার) দূরত্ব অতিক্রম করেছেন। এই দূরত্ব পৃথিবীকে আড়াইবার প্রদক্ষিণ করার সমান। ইনফ্যান্টিনোর এই ভ্রমণ সম্ভব হয়েছে কাতার সরকারের বহরের অন্তর্ভুক্ত একটি গালফস্ট্রিম জি৬৫০ জেটের মাধ্যমে, যা বিশ্বকাপের স্পন্সর কাতার এয়ারওয়েজের প্রাইভেট চার্টার বিভাগ পরিচালনা করে।

টুর্নামেন্ট শুরুর আগে ৯ জুন লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে মেক্সিকো সিটিতে প্রথম ফ্লাইটের পর থেকে বিমানটি প্রতিদিন গড়ে একাধিক ফ্লাইট সম্পন্ন করেছে, কখনো কখনো একদিনে তিনটির বেশি উড়ানও ছিল। শুধু বিশ্বকাপের ম্যাচ নয়, ইনফ্যান্টিনোর সফরসূচিতে নিউইয়র্কে ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’-এর সাক্ষাৎকার এবং মিয়ামিতে ফিফার শীর্ষ সম্মেলনও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়া কাতারের প্রাক্তন আমিরের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নিতে দোহা পর্যন্ত উড়ে যেতে হয়েছিল তাকে, যা যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসার পর সেমিফাইনালের সময় সঠিকভাবে পৌঁছানোর জন্যই ছিল।

এপির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ফ্লাইটআওয়্যার নামক উড়ান ট্র্যাকিং সাইটের তথ্যের ভিত্তিতে দেখা গেছে, রোববারের ফাইনালের আগ পর্যন্ত ইনফ্যান্টিনো বিশ্বকাপের মোট ১০৪টি ম্যাচের মধ্যে ৪৩টিতে উপস্থিত ছিলেন। তিন দেশ (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো) জুড়ে ১৬টি শহরে অনুষ্ঠিত এই টুর্নামেন্টের প্রতিটি ভেন্যুতেই অন্তত একটি করে ম্যাচ তিনি প্রত্যক্ষ করেন। সবচেয়ে বেশি পাঁচবার তিনি গিয়েছিলেন মিয়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে। একদিনে দুটি ম্যাচ দেখেছেন ১৩ দিন, যেগুলো প্রায়শই শত শত মাইল দূরের স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

ভ্রমণের সময় ব্যবহার করা হয়েছিল মোট ২১টি বিমানবন্দর। এর মধ্যে প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছাড়াও ছোট ছোট জেনারেল ও বিজনেস এভিয়েশন বিমানবন্দর যেমন আটলান্টার ফুলটন কাউন্টি এক্সিকিউটিভ এয়ারপোর্ট ও মিয়ামির ওপা-লকা এক্সিকিউটিভ এয়ারপোর্ট রয়েছে। সেমিফাইনাল পর্যন্ত এই জেটটি উত্তর আমেরিকার অভ্যন্তরে ২৩টি আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করেছে।

উড়ানের সময়ের হিসেবে দেখা যায়, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ভ্রমণ ব্যতীত টুর্নামেন্ট চলাকালে গালফস্ট্রিম জেটটি মোট ১১৫ ঘণ্টা উড়েছে। ফলে প্রায় পাঁচ পূর্ণ দিন ধরে তিনি আকাশেই ছিলেন। একই গতিতে বাণিজ্যিক বিমান চালালে এই সময়ে নিউ ইয়র্ক থেকে লস অ্যাঞ্জেলেস ২০ বার যাওয়া সম্ভব। সবচেয়ে দীর্ঘ ফ্লাইটটি ছিল মিয়ামি থেকে সিয়াটল, যা ৩৪৪ মিনিট (৫ ঘণ্টা ৪৪ মিনিট) স্থায়ী হয়। সেখানে গিয়ে তিনি বেলজিয়াম-মিশর ম্যাচ দেখেন। এই সময়কাল পুরো তিনটি বিশ্বকাপ ম্যাচের সমান। অপরদিকে, সবচেয়ে ছোট ফ্লাইটটি ছিল ২৮ মিনিটের, যা সিয়াটল থেকে ভ্যাঙ্কুভার পর্যন্ত। এই সময়টুকু একটি টেলিভিশন সিটকমের এক পর্বের সমান। সেই দিন তিনি সিয়াটলে যুক্তরাষ্ট্র-বেলজিয়াম এবং পরদিন ভ্যাঙ্কুভারে সুইজারল্যান্ড-কলম্বিয়া ম্যাচ উপভোগ করেন।

একদিনের ভ্রমণে সর্বাধিক ৫,৭৭২ মাইল (৯,২৮৯ কিলোমিটার) পথ পাড়ি দেওয়া হয় ২৬ জুন। ওই দিন সকালে মিয়ামি থেকে ডালাস, তারপর সিয়াটল, এবং শেষ পর্যন্ত রাতে সিয়াটল থেকে পরদিন সকালে মিয়ামিতে ফিরে আসেন। ফিরে এসে তিনি কলম্বিয়া-পর্তুগাল ম্যাচ দেখেন।

পরিবেশগত প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ফিফা ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বকাপ ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম থেকে কার্বন নিঃসরণ অর্ধেকে কমাতে এবং ২০৪০ সালের মধ্যে নেট-জিরো নিঃসরণে পৌঁছানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর মতে, তিন দেশে বিস্তৃত এই বিশ্বকাপ দল, ভক্ত ও কর্মকর্তাদের ব্যাপক বিমান ভ্রমণের কারণে ইতিহাসের সবচেয়ে কার্বন-নিবিড় বিশ্বকাপ হয়ে উঠতে পারে। ফিফা অবশ্য ইনফ্যান্টিনোর ভ্রমণসূচি ও ব্যবস্থা নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।