অন্তর্বর্তী সরকার দেশে বিনিয়োগনির্ভর ও কর্মসংস্থানভিত্তিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করছে। এ লক্ষ্যে অর্থ পাচার বন্ধ করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি। গত শনিবার রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিকস (ডায়রা) আয়োজিত বেঙ্গল কনফারেন্সের দ্বিতীয় দিনে ‘ওয়ে ফরওয়ার্ড ফর এমার্জিং ইন্ডাস্ট্রিজ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক প্যানেল আলোচনায় এ মন্তব্য করেন তিনি।

শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদনের তথ্য উল্লেখ করে জোনায়েদ সাকি বলেন, বিগত ১৬ বছরে বাংলাদেশ থেকে মোট ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এই অর্থ পাচার বন্ধ করা গেলে বিনিয়োগের জন্য পুঁজির চাপ সৃষ্টি হবে এবং অলস অর্থ উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত হবে বলে তিনি মনে করেন। এছাড়া উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর জোর দেন প্রতিমন্ত্রী। তার ভাষ্য, ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো একই যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেও বাংলাদেশের তুলনায় বেশি উৎপাদনশীলতা অর্জন করছে। সরকার দক্ষ কর্মী তৈরির লক্ষ্যে শিক্ষা ও শিল্প খাতের মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করছে। অন্যদিকে ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বৃদ্ধির দায়িত্ব শিল্প মালিকদেরই নিতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

জ্বালানি খাতের বিদ্যমান সংকট মোকাবিলায় সরকার ‘আত্মনির্ভর জ্বালানি নীতি’ গ্রহণ করেছে জানিয়ে জোনায়েদ সাকি বলেন, এটি একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। দেশীয় গ্যাস উত্তোলনের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চলছে এবং ইতোমধ্যে পাঁচটি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী দশ বছরের মধ্যে মোট জ্বালানি চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে (যেমন সোলার) আনার নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। সোলার প্রকল্পের জন্য জমি, ঋণ ও কর সুবিধা দিয়ে বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

ব্যবসার প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সরকার দ্রুত লাইসেন্স প্রদান ও ইউটিলিটি সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রতিমন্ত্রীর মতে, দুই দিনের মধ্যে লাইসেন্স এবং সাত দিনের মধ্যে ইউটিলিটি সংযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, তৈরি পোশাক, লজিস্টিকস ও চামড়া শিল্পের পাশাপাশি আইসিটি, ইলেকট্রনিকস, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো নতুন ৮ থেকে ১০টি বিনিয়োগ ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে।

প্যানেল আলোচনায় সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের মূলত সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। সরকারের উচিত উৎপাদনশীলতাকে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার বিষয়ে ভাবা। দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজী ফয়সাল বিন সিরাজ নীতিমালার ঘাটতির কথা উল্লেখ করে পুরো ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।

ব্রেইন স্টেশন ২৩ পিএলসির পরিচালক মিজানুর রহমান জানান, নীতিগত প্রতিবন্ধকতার কারণে উদ্যোক্তারা উৎসাহ হারান। নিউএজ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহিম বলেন, একটি ব্যবসা শুরু করতে গেলে ৫০টি সরকারি সংস্থার কাছ থেকে অনুমোদন ও ছাড়পত্র নিতে হয়। আগের সরকারগুলো ওয়ান–স্টপ সার্ভিস চালু করতে চাইলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ব্যবসা-বাণিজ্যের পথ সুগম করতে সরকারকে এই সংকট সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

অ্যাগ্রো কোম্পানি আইফারমারের চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার মাকামে মাহমুদ বলেন, ব্যবসায় দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান বহু বাধার মুখে পড়েন উদ্যোক্তারা। লালফিতার দৌরাত্ম্যে শুরুর উদ্যোগ ও সৃজনশীলতা হারিয়ে যায়। এতে সময় নষ্ট হয় এবং উদ্যোক্তারা উদ্ভাবনী হওয়ার সুযোগ পান না বলে তিনি মন্তব্য করেন।